
ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন: সম্প্রতি ভারতে বাংলাদেশের হাই কমিশন ও ডেপুটি হাইকমিশন ভবনে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের ঘটনা কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন নয়; এটি ভিয়েনা কনভেনশন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিরও পরিপন্থী। অভিযোগ আছে, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এই হামলাগুলো শুধু একটি ভবনে আক্রমণ নয়; এগুলো ভারতীয় জনগণের মধ্যে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করার একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও দেখা যায়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই ধরনের উত্তেজনা তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়—কোনো সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়লে প্রায়ই বাহ্যিক “হুমকি” তৈরি করে জনমতকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার কৌশল গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের দিক থেকে পরিস্থিতি পরিষ্কার। বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটের অংশ নয় এবং কখনোই কোনো দেশের বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে জোটনিরপেক্ষ, আত্মরক্ষামূলক এবং সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক। চীন, তুরস্ক বা অন্যান্য দেশের সঙ্গে পেশাগত ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সীমিত, এবং কোনো সামরিক বাধ্যবাধকতা নেই।
তবুও, বাংলাদেশকে ঘিরে কৌশলগত অক্ষ, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কিত গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ন্যারেটিভ। ইতিহাসের উদাহরণ আছে—২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র WMD (Weapons of Mass Destruction) থাকার দাবি করে। পরবর্তীতে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, সেই ন্যারেটিভ জনমতকে প্রভাবিত করতে কার্যকর ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে আজকের “নিরাপত্তা ঝুঁকি”, “কৌশলগত অক্ষ” বা “আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা” প্রবাদগুলি বাংলাদেশকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। কূটনৈতিক মিশনে হামলা এই ন্যারেটিভের সঙ্গে মিলিত হয়ে জনমতকে প্রভাবিত করছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সচেতনতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। নাগরিকদের বুঝতে হবে—বাহ্যিক গুজব, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং মিডিয়া-চালিত বিভ্রান্তি সরাসরি আমাদের দেশের নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। সতর্কতা, যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি জনগণের ঐক্যই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সংযত কিন্তু দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখতে হবে। কূটনৈতিক প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরা এবং সত্যভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে যোগাযোগ জোরদার করা জরুরি। উত্তেজনা এড়ানো দরকার, কিন্তু নীরবতাও বিপজ্জনক। সংযমের সঙ্গে দৃঢ়তার সমন্বয়ই প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কোনোভাবে ভারতের জনগণের সঙ্গে বিরোধী নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন উগ্রতা এবং স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক স্বার্থ জনমতকে প্রভাবিত করে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো সচেতন নাগরিক সমাজ, দায়িত্বশীল কূটনীতি এবং সত্যভিত্তিক বার্তা।
আতঙ্ক নয়, প্রতিক্রিয়াশীলতা নয়—জাতীয় সচেতনতা, সংযম ও দৃঢ়তাই বাংলাদেশের শক্তিশালী হাতিয়ার।
ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বিঃদ্রঃ এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব; এটি কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়।