
ড. আ. ন. ম এহছানুল মালিকী: ভোর ৬টার নিস্তব্ধতা ভেঙে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জটিল, প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের চূড়ান্ত পৃষ্ঠাটি ওলটালেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৮০ বছর। তার এই প্রয়াণের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যা রূপ নেয় স্মরণকালের বিরল জনসমাগমে। বুধবার বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে জানাজা শেষ হয়; ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। জানাজায় অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। ভোর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় জড়ো হয়ে বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েন; অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেকেই জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। জানাজা শেষে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার প্রয়াণ কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়া নামে পরিচিত একটি রাজনৈতিক ধারা ও গোষ্ঠীর প্রায় পাঁচ দশকের সক্রিয় এবং ক্ষমতাসীন-বিরোধী দলীয় নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র পর্বের সমাপ্তি ঘটাল।
১৯৪৫ সাল (কিংবা কোনো কোনো সূত্রে ১৯৪৬) দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়ার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন খালেদা খানম পুতুল। পিতা ইস্কান্দার মজুমদারের চা ব্যবসায়ের সুবাদে পরিবারটি স্বচ্ছল ছিল। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করার পরই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। একই বছরের আগস্ট মাসে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বৈবাহিক মিলন তাকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতির জীবনসঙ্গী এবং একদিন দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে আসীন হতে সাহায্য করবে, তখন তা কেউ কল্পনাও করেনি। সামরিক পত্নী হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান) কাটানো বছরগুলো তার রাজনৈতিক বিশ্বদৃষ্টি গঠনে প্রাথমিক ভূমিকা রাখে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আটক ও গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৭৭ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তিনি দেশের ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে পরিচিতি পান। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড তার জীবনকে একেবারে উলটপালট করে দেয়। বিধবা ও দুই কনিষ্ঠ পুত্রসন্তানকে নিয়ে তার তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তখন নেতৃত্বশূন্য। দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধ ও চাপে তিনি রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। দ্রুতই তার অন্তর্ণিহিত নেতৃত্বগুণ ও ‘জিয়ার সহধর্মিনী’ পরিচয়ের কারণে তিনি দলের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু সেই পদে বহাল থাকেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই বিএনপি একটি শক্তিশালী, দেশব্যাপী সংগঠনে পরিণত হয়।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে খালেদা জিয়া তার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি ‘সাত দলীয়’ এবং পরে ‘পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট’ গঠন করে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ‘এরশাদ হটাও’ এই এক দফার আন্দোলনে তিনি গ্রেপ্তার হন, কারাবরণ করেন কিন্তু নতি স্বীকার করেননি। এই সময়টিতেই তিনি রাস্তার রাজনীতির মাধ্যমে গণমানুষের মধ্যে ‘জননেত্রী’ বা ‘খালেদা মা’ হিসেবে আবির্ভূত হন। দীর্ঘ ৯ বছর আপসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বেনজির ভুট্টোর পর তিনিই ছিলেন মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান।
প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬) তার সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন। তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিরোধী দলের ব্যাপক বর্জনের কারণে ‘একদলীয় নির্বাচন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ সুগম হয়।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্য জোট ও জাতীয় পার্টি (এরশাদ)-এর সঙ্গে গঠিত চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে ব্যাপক বিজয় অর্জন করে। তার তৃতীয় ও দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রীত্ব (২০০১-২০০৬) ছিল মিশ্র সাফল্য ও বিতর্কের। এই সময়ে দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে, ডিজিটাল টেলিফোনি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যাপক প্রসার হয়, নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘লুক ইস্ট’ নীতি জোরদার হয়। ২০০৪ সালে ফোর্বস সাময়িকী তাকে বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাশালী নারীর তালিকায় ১৪তম স্থান দিয়েছিল। কিন্তু এই মেয়াদই তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়। ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ওহঃবৎহধঃরড়হধষ-এর দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বিশ্বের ‘শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’-এর তকমা বহন করে। রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং মূল বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে চরম বৈরিতা এই সময়ের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৬ সালের শেষদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সংকট দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তার সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়া তার দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ দুর্নীতির একাধিক মামলায় আটক হন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং পুনরায় কারাগারে প্রেরিত হন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ, বৈশ্বিক কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে সরকার তাকে ‘মানবিক কারণে’ শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিলেও তাকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এই সময়ে তার স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটে। ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আগস্ট মাসে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তার সকল সাজা মওকুফ করা হয়। অতঃপর ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর, উচ্চ আদালত তাকে ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, ‘‘প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এ মামলা করা হয়েছিল। মামলার বিচার ছিল সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই মামলা দিয়ে খালেদা জিয়াকে সামাজিকভাবে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে।’’ এই রায় তার এবং তার সমর্থকদের জন্য একটি নৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হয়।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল আঘাত ও শোকের এক ট্র্যাজেডি। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাকে প্রচণ্ড আঘাত দেয়। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় তার কনিষ্ঠ ও প্রিয় পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর আকস্মিক মৃত্যু তার জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষত সৃষ্টি করে। বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন নির্বাসিত থাকায় জীবনের শেষ প্রান্ডে তিনি একরকম নিঃসঙ্গতাই বরণ করেছিলেন। বার্ধক্যজনিত ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি ও যকৃতের জটিলতায় তিনি দীর্ঘদিন ভুগছিলেন। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন গমন করেন, কিন্তু সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারেননি।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ধারার সমাপ্তির ঘণ্টাধ্বনি। তিনি কেবল একজন নেত্রীই ছিলেন না, ছিলেন জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ ও গোষ্ঠীর মূর্তপ্রতীক। তার নেতৃত্বে বিএনপি কেবল একটি দল নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার একটি বিকল্প ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তিনি ছিলেন এক কঠোর সংগ্রামী, যে কোনও আপোস বা দোলাচল ছাড়াই তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।
তার রাজনৈতিক জীবন পরিপূর্ণ ছিল উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়, সম্মান-অপমান এবং অভিযোগ-খালাসের নাটকীয়তায়। তিনি ছিলেন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব; তার প্রশংসকদের কাছে তিনি ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ ও ‘জননেত্রী’, যিনি একটি দলকে শূন্য থেকে গড়ে তুলে তাকে তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। তার সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একটি সহিংস ও বিভেদকামী রাজনীতির প্রতীক, যার শাসনামলে দেশ দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের দিকে ঝুঁকেছিল।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দ্বি-মেরুকৃত রাজনীতির এক মেরুর প্রধান চালিকাশক্তি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। বিএনপি এখন একটি নেতৃত্বশূন্যতা ও পরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি। অন্যদিকে, তার প্রয়াণ দেশের রাজনীতিতে একটি সম্ভাব্য নতুন সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম চিরকালই একটি স্বতন্ত্র, জটিল এবং আবেগপ্রবণ অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত থাকবে। তার জীবন ও মৃত্যু প্রমাণ করে, ব্যক্তিত্বই ইতিহাস গড়ে, আবার ইতিহাসের পট পরিবর্তনেই ব্যক্তির পরিণতি নির্ধারিত হয়।