
তন্ময় আলমগীর, কিশোরগঞ্জ: নাদিম মাহমুদ হারুন। একজন সচেতন রাজনীতিবিদ ও চিত্রশিল্পী। যার হাত ধরে প্রতি বছর প্রাণ ফিরে পায় কিশোরগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। গুরুদয়াল সরকারি কলেজ কতৃপক্ষের উদ্যোগে ১৯৯৬ সাল থেকে শহীদ বেদিতে দেয়াললিখনের কাজ করে আসছেন তিনি।
প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে তাঁর ব্যস্ততা বেড়ে যায়, আর রঙ-তুলির ছোঁয়ায় শহীদ মিনার হয়ে ওঠে ভাষা আন্দোলনের চেতনার এক জীবন্ত ক্যানভাস।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার কেবল একটি স্থাপনা নয়—এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। সেই প্রতীকে প্রাণ সঞ্চার করেন নাদিম মাহমুদ হারুন।
শহীদ বেদির দেয়ালে তিনি তুলে ধরেন ভাষা সৈনিকদের অমর বাণী, কবিতার পঙ্ক্তি ও চেতনার আহ্বান। তাঁর নিখুঁত হাতের লেখায় ফুটে ওঠে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো তিনি গুরুদয়াল সরকারি কলেজের উদ্যোগে দেয়াললিখনের কাজ শুরু করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর একুশের প্রাক্কালে তিনি নিজ দায়িত্বে শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়ে রঙ ও তুলির মাধ্যমে বাণী লিখে চলেছেন।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে রঙ, নকশা ও উপস্থাপনার ধরন; কিন্তু বদলায়নি তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতা।
নাদিম মাহমুদ হারুন বলেন, “ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমার নৈতিক দায়িত্ব। যতদিন পারি, ততদিন শহীদ মিনারের দেয়ালে তাঁদের বাণী লিখে যেতে চাই।”
তার এই উদ্যোগে অনেক তরুণও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। কেউ রঙ মেশাতে সাহায্য করেন, কেউ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হন। ফলে এটি এক ধরনের সামাজিক উদ্যোগে রূপ নিয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি এলে ভোরের আলো ফোটার আগেই শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদনের মুহূর্তে দেয়ালে লেখা বাণীগুলো যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও ত্যাগের কথা।
দর্শনার্থীরা বলেন, নাদিম মাহমুদ হারুনের হাতের লেখায় এক ধরনের আলাদা সৌন্দর্য ও আবেগ রয়েছে, যা শহীদ মিনারের পরিবেশকে আরও গাম্ভীর্যময় করে তোলে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করেন, এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ ভাষা আন্দোলনের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে থেকেও গুরুদয়াল সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ নাদিম মাহমুদ হারুন।
প্রতিবছরের মতো এবারও একুশের প্রাক্কালে তাঁর তুলির আঁচড়ে সেজে উঠেছে কিশোরগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।