
এমএ মান্নান, ভোলা: ভোলার দৌলতখান উপজেলার রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা অন্যত্র স্থানান্তর করার খবর পাওয়া গেছে।
৮ মার্চ (রবিবার) শাখা ম্যানেজার নেসার উদ্দিন জানান, স্থানীয় হাজিপুর কামিল মাদ্রাসার বাংলা বিষয়ের প্রভাষক গোলাম মাওলার নামে এই ব্যাংকে একটি টিচার্স সেভিংস অ্যাকাউন্ট রয়েছে। গোলাম মাওলা এবছর জানুয়ারি মাসের বেতন ভাতা উত্তোলন করতে গত ০২ মার্চ সোমবার ব্যাংকে এসে জানতে পারেন, তার অ্যাকাউন্টের কোনো টাকা নেই।
ব্যাংক ব্যবস্থাপক নেছার উদ্দিন বলেন, গ্রাহক গোলাম মাওলার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তার অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করি। দেখা যায় গত ১০ ফেব্রুয়ারি তার অ্যাকাউন্টে জানুয়ারি মাসের বেতন ২৬,৭৬০ টাকা জমা হয় এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি তার অ্যাকাউন্ট থেকে BEFTN (বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক) এর মাধ্যমে ৫,০০০ টাকা পূবালী ব্যাংকের গোপালগঞ্জ শাখার একটি এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এরপর একই দিনে ২১,৫০০ টাকা একই অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। ফলে তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই।
ব্যাংক ব্যবস্থাপক আরো বলেন, “আমরা ০২ মার্চ তারিখেই বিষয়টি রূপালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের আইটি বিভাগকে জানিয়েছি।
ম্যানেজার বলেন, আমাদের আবেদনের প্রেক্ষাপটে আজ ৮ মার্চ রবিবার ঢাকা থেকে ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞ আসেন। তারা বিষয়টির উপর ব্যাপক পর্যালোচনা করেন। তারা বলেছে, "লেনদেনগুলো গ্রাহক গোলাম মাওলার অ্যাপ থেকেই করা হয়েছে এবং প্রতিটি লেনদেনের সময় তার মোবাইলে এসএমএসও পাঠানো হয়েছে। এমনকি অনুমোদনহীন লেনদেনের নিশ্চিত করতে তারা গোলাম মালার সাথে ভিডিও কলে কথা বলে হ্যাকার তার আই কন্টাকও নিয়েছে”। ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞ টিমের বলছে, টাকা পাঠানো হয়েছে গোপালগঞ্জে একটি পূবালি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে, যার মালিক বৃষ্টি ঘোষ।
এদিকে বৃষ্টি ঘোষকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সব সময়ই তার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তুলে নেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
একটি প্রতারণামূলক প্রলোভন বার্তার মাধ্যমেই চক্রটি ভুক্তভোগী গোলাম মালার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে। বার্তায় ছিলো একটি লিংক, যা ক্লিক করলেই ভুক্তভোগী গোলাম মাওলার মোবাইল থেকে সরাসরি ব্যাংক তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এরপর সহজেই তারা ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা সরিয়ে ফেলে।
এই প্রতারক চক্র ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে গ্রাহকের অনলাইন উৎস থেকে, যেখানে নিজের মোবাইল নম্বর, ইমেইল ব্যবহার করে পাঠানো হয়েছে ‘পুরস্কার জেতার’ বা ‘অফার পাওয়ার মেসেজ। মেসেজে তার ব্যাংকের ও ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ আলোচনায় গোলাম মাওলা এমন সব তথ্য স্বীকার করেন।
এদিকে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতারকরা এখন কল মার্জিং, ভয়েস মেইল হ্যাক, কিউআর কোড জালিয়াতি এবং স্ক্রিন শেয়ারিং প্রতারণার মতো উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করছে। কল মার্জিং প্রতারণায় কোনো ব্যক্তিকে ফোন করে বলা হয় তিনি যেন একটি ইভেন্ট কাভার করেন। ঠিক সেই সময় আরেকটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে, যেটি নাকি কোনো ‘ভিআইপি নম্বর’।
প্রতারক ব্যক্তি ভুক্তভোগীকে বলে, দুই কল মার্জ করতে। কল মার্জের পর প্রতারক সহজেই শুনতে পারে ব্যাংক বা অ্যাপের মাধ্যমে আসা ওটিপি, যার মাধ্যমে তারা টাকা চুরি করে বা অ্যাকাউন্ট দখলে নেয়।
এদিকে অনেক অনুসন্ধান করে জানা যায়,
অনেক সময় গ্রাহকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করেন এবং এতে প্রতারকরা তাদের মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তখন ফোনে থাকা তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা করা হয়।
এখন তারা ওটিপি বা এটিএম পিন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
এদিকে গোলাম মাওলা বলেন, তিনি কখনও ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ রূপালী ই-ব্যাংক (Rupali eBank) ব্যবহার করেননি এবং কখনও এটিএম কার্ড দিয়েও টাকা তোলেননি। তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না কী হয়েছে। আমি সাধারণত চেকের মাধ্যমে বেতন উত্তোলন করি।
এক প্রশ্নের উত্তরে গোলাম মাওলা অভিযোগ করে বলেন, এ বিষয়ে দৌলতখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। পুলিশ বলছে, ব্যাংক সংক্রান্ত বিষয়, যা ব্যাংককেই সমাধান করতে হবে।