
ফিরোজ মাহবুব কামাল: বাংলার সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংসতম ও বর্বরতম গণহত্যা হলো একাত্তরের বিহারি নির্মূলের গণহত্যা। অনুমান করা হয় প্রায় ২ থেকে ৩ লক্ষ বিহারীকে হত্যা করা হয়। নারী, শিশু, বৃদ্ধরাও সে গণহত্যা থেকে রেহাই পায়নি। গৃহে আগুন দিয়ে সে গৃহের সবাইকে পুড়িয়ে হত্যার অসংখ্য নৃশংস কাণ্ডও ঘটানো হয়েছে। সে বর্বর কাণ্ডগুলি ঘটেছে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, পাকশি, শান্তাহারসহ বাংলাদেশের বহু বিহারি বসতিতে। হাজার হাজার বিহারি মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়েছে। প্রতিটি বিহারি পরিবারের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কেড়ে নেওয়া হয়। বাংলার ইতিহাসে এত বড় অপরাধ কর্ম আর কোন কালেই হয়নি। কোন বিবেকবান মানুষের হৃদয় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ব্যথিত না হয়ে পারে না।
বিহারিদের অপরাধ তারা ভারতে বিহার থেকে প্রাণ বাঁচাতে পশ্চিম পাকিস্তানের না গিয়ে কাছের পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের সে সিদ্ধান্তই একাত্তরে তাদের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। প্রশ্ন হলো, সাবালক বিহারিগণ না হয় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, কিন্তু যে হাজারো বিহারি শিশুদের ও গৃহবধু নারীদের হত্যা করা হলো তাদের কি অপরাধ ছিল? তাছাড়া সব বিহারি কি পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরেছিল?
কিন্তু সে ব্যথা ও সে মানবতা একটুও দেখা যায়নি শেখ মুজিব, মেজর জিয়া, মাওলানা ভাসানী, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও হাসিনার ন্যায় নেতা-নেত্রীদের মাঝে। বাংলার ইতিহাসে এরাই যে সবচেয়ে বিবেকশূন্য ও মানবতাশূন্য নেতা-নেত্রী তার প্রমাণ তাদের এই নিষ্ঠুর নীরবতা। এই হতভাগা ও দুর্দশাগ্রস্থ মানুষদের জন্য তারা কিছুই করেনি। এই মানুষগুলো এখনো বেঁচে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থার করুণার উপর। বাঙালির মানবতাশূন্যতার এটি হলো দৃশ্যমান রূপ। অথচ এ গুরুতর নৈতিক রোগের চিকিৎসা নিয়ে আজও কোন উদ্যোগ নেই। এরূপ মানবতাশূন্যতা নিয়ে সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায়?
একই রূপ বিবেকহীন নীরবতা দেখিয়েছে বাংলাদেশের মিডিয়াকর্মী, সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক ও বুদ্ধিজীবীগণ। তাদের আলোচনার ও লেখনীর বিষয়বস্তুতে এই দুর্দশাগ্রস্থ বিহারিরা নেই। পাকিস্তান ভাঙার পর ১০ লাখের বেশী বাঙালি করাচীতে ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাচ্ছে। তারা সে দেশে গেছে অবৈধ ভাবে এবং অবৈধ আবাদি গড়ে তুলেছে। তাদের কেন পাকিস্তানের নাগরিকত্ব দেয়া হয়না -তা নিয়ে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাতে লেখালেখি হয়। কিন্তু যে বিহারি নারী-পুরুষের জন্ম বাংলাদেশে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে -তা নিয়ে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় কোন বর্ণনা নাই।
আজও বিহারিদের বসবাস নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বিবর্জিত নোংরা বস্তিতে। তাদের সন্তানদের নাই স্কুল- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার সুযোগ। নাই চাকরি-বাকরির অধিকার। তাদের দেয়া হয় না পাসপোর্ট। তাদের নাই চাকরি-বাকরির অধিকার। তাদের নাই বস্তির বাইরে যেয়ে ঘর বাধার সুযোগ। তাদের বন্দি জীবনটা শুধু বস্তির মধ্যে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলিও এ নিয়ে নিশ্চুপ। যেন তারা না কিছু দেখেছে, না কিছু শুনেছে। যেন গাছপালা।
বিহারিদের নিয়ে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির ভূমিকাও একই রূপ। বাংলাদেশের এই প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের ব্যাপারে নিরব ও নিশ্চুপ -যেন বিহারিদের বিরুদ্ধে কোন অন্যায়-অবিচার ও অপকর্মই কোন কালে হয়নি এবং এখনো হচ্ছে না। হয়তো নতুন সংসদেও এ নিয়ে কোনদিন আলোচনা বসবে না। তাদের যুক্তি হয়তো এটিই, বিহারিরা যেহেতু বাঙালি নয়, তাদের নিয়ে সংসদে আলোচনার কিছু নাই। এটি তো নিরেট বর্ণবাদ। অথচ যারা ইংরেজ নয়, ব্রিটেনে বসবাসকারি এমন বাঙালি, ভারতি, পাকিস্তানি ও আফ্রিকানদের সমস্যা নিয়েও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আলোচনা হয়। কারণ তারা ব্রিটেনের নাগরিক। দেশটিতে বর্ণবাদ নিষিদ্ধ। অথচ বাংলাদেশে বর্ণবাদ যে কতটা বেঁচে আছে -তা বুঝা যায় বিহারিদের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নীতি দেখলে।
বাঙালি মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে বড় নৈতিক, মানবিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী হল এই বিবেকশূন্য ও মানবতাশূন্য রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা-নেত্রীগণ। এদের কারণেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিরেট বদমাইশতন্ত্র। সেই বদমাইশতন্ত্রের প্রমাণ হলো, বাংলাদেশ পাঁচবার বিশ্ব রেকর্ড করেছে দুর্বৃত্তিতে তথা বদমাইশিতে। দেশটিতে মানবতা বেঁচে থাকলে কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন অপমানের পদক পেতে হতো? বাংলাদেশের সংকট তাই শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং সেটি হলো মানবিক গুণের সভ্য মানব রূপে বেড়ে উঠায়। বাংলাদেশের সকল সংকটের শুরু এখান থেকেই। ২৯/০৩/২০২৬