
এমএম রহমাতুল্লাহ: গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনরায় বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসির অভিযোগ তুলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এক সেমিনার থেকে। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, জনরায়ের প্রতি অবহেলা অব্যাহত থাকলে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত “গণভোটের আলোকে জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি: সরকারের দায় ও জবাবদিহিতা” শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও ছাত্র প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, বর্তমান সরকার জনরায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে বিভিন্ন দ্বিচারিতামূলক আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার শুধু ‘জুলাই সনদ’-এর বিরোধিতাই করছে না, বরং সামগ্রিক সংস্কারের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে ক্ষমতাসীন দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন এনে একটি স্থায়ী সংকট তৈরি করেছে। বর্তমান সংবিধানে ক্ষমতা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাসহ প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সরকার তালবাহানা করছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। তিনি দাবি করেন, জনরায়ের অবমূল্যায়ন করলে সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশিষ্ট আলোকচিত্রশিল্পী ও সমাজকর্মী শহীদুল আলম বলেন, দেশের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে সংস্কার অপরিহার্য। মতভেদ থাকা স্বাভাবিক হলেও বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আইনি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি অতীতে সংবিধানের অপব্যবহারের অভিযোগও তোলেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, জনরায়ের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনি ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিরা জনরায় দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আল্টিমেটাম দেন। তারা জানান, প্রয়োজনে ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ পর্যন্ত আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সেমিনারে বক্তারা সর্বসম্মতিক্রমে সরকারকে দ্রুত জনরায় বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।