
এমএম রহমাতুল্লাহ: আগামীর রাজনীতি চরম প্রতিযোগিতামূলক হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মাঠের বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীকে সবচেয়ে সুশৃঙ্খল দল হিসেবে দেখা হলেও তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশের ঝোঁক এখন নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির দিকে।
ট্যাগিং ভয় ও চাকরির ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণরা জামায়াতকে পছন্দ করলেও ‘রাজাকার’ ট্যাগিং, গুম-খুন-ক্রসফায়ারের ভয় এবং চাকরিপ্রাপ্তিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে জামায়াত-শিবির খোঁজার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, এখন বিএনপিও একই পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন বাস্তবতায় তরুণরা জেনেশুনে এই ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
জামায়াতের কৌশলগত সংকট
অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতের মতো পোড় খাওয়া দলও তরুণদের এই উদ্বেগকে আমলে নেয়নি। দলটির জন্য সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তিনটি পথ আলোচনায় আসছে: ১. নাম পরিবর্তন করে ভিন্ন নামে রাজনীতি, ২. রাজনৈতিক শাখা থেকে ধর্মীয় শাখা আলাদা করা, ৩. পূর্বের কোনো ভুলের দায় দলীয়ভাবে না নেওয়া।
‘আখতার মডেল’ ও নেতৃত্বের স্পেস
আলোচনায় উঠে এসেছে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের এমপি আখতার হোসেনের উদাহরণ। ধাপ সাতগাড়া কামিল মাদরাসার সাবেক ছাত্র ও একসময়ের ছাত্রশিবির কর্মী আখতার নানা পথ পেরিয়ে এনসিপির সেকেন্ড ম্যান হয়েছেন এবং দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। জোটের স্বার্থে জামায়াত তাদের মহানগরী আমীর পর্যায়ের নেতাকে বসিয়ে দিয়ে আসনটি এনসিপির তরুণ নেতাকে ছেড়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, গতানুগতিক পদ্ধতিতে ছাত্রশিবির শেষে জামায়াতের রংপুর মহানগরী শাখায় যুক্ত হলে আখতার সর্বোচ্চ ওয়ার্ড সভাপতি বা থানা সেক্রেটারি হতেন। মহানগরী আমীরের নির্বাচনী কর্মী হিসেবে তাঁকে পথে পথে ঘুরতে হতো। এখন উল্টো মহানগরী আমীরকেই আখতারের নির্বাচনী কর্মী হিসেবে কাজ করতে হয়েছে।
আখতার ও তাঁর মতো অসংখ্য এনসিপি নেতা ছাত্রশিবিরের বর্তমান নেতাকর্মীদের সামনে ‘এক্সাম্পল’ হয়ে উঠছেন। সম্প্রতি শিবিরের সাবেক দুজন কেন্দ্রীয় নেতা এনসিপির শীর্ষ পদে আসীন হওয়ায় এই প্রবণতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘ভাই বনাম শ্যালক’ বিতর্ক
জামায়াতের ভেতরে ‘ভাইয়ের চাইতে শ্যালককে গুরুত্ব’ দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা চাউর হচ্ছে। অভিযোগ, অন্য দল গঠন করে জামায়াত আমীরের যে গুরুত্ব পান, শিবিরের অনেক সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি বা সদস্যও তা পান না। শিবিরের কর্মীরা যখন দেখছে জামায়াতে গতানুগতিক সিস্টেমের মারপ্যাঁচে তাদের পোটেনশিয়ালিটি এক্সপোজ করার স্পেস নেই, তখন সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। একে জামায়াতের ভবিষ্যৎ রিক্রুটমেন্টের জন্য ‘ভয়াবহ এলার্মিং ইস্যু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির ঝুঁকি ও গ্রাম-শহরের ফারাক
বিএনপির গতানুগতিক রাজনীতি জেন-জি ও জেন-আলফাকে আকর্ষণ করতে পারছে না বলে মত বিশ্লেষকদের। ক্ষমতার বাইরে গেলে দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। তবে গ্রামে এখনও শিবির অনেক এগিয়ে। এনসিপির জোয়ার আপাতত শহরকেন্দ্রিক।
এনসিপির কৌশল
ছাত্রলীগের যারা গুম, খুন, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসের সাথে জড়িত নয়, তাদের কাছে টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। বিএনপি শুরু থেকেই এই কৌশল নিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সব মিলে রাজনীতি জমজমাট হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, “কাঁদা ছোড়াছুড়ি করে লাভ নেই। প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে। যে দল যত বেশি গণমুখী, ভারতবিরোধী ও সততার রাজনীতি করতে পারবে, শেষ পর্যন্ত সে দলই বিজয়ের মুকুট পরবে।”