
মো: মুখলেছুর রহমান: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এমন এক সংকটকাল অতিক্রম করছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু আর্থিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরও। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অনিশ্চয়তা, অনিয়ম, মালিকানা পরিবর্তন, তারল্য সংকট ও জনআস্থার অবক্ষয় তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে জাতীয় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের জন্য একটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সঠিক, স্বচ্ছ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত চার দশকে এই খাত দেশের কোটি কোটি মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস, সুদবিরোধী মানসিকতা এবং বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের সঞ্চয় ইসলামী ব্যাংকগুলোতে রেখেছেন। গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহুরে মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী শ্রমিক—অনেকের কাছেই ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি একটি বিশ্বাসের প্রতীক। ফলে এই খাতের প্রতি মানুষের আস্থায় আঘাত লাগা মানে কেবল ব্যাংকিং খাতে সংকট সৃষ্টি হওয়া নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের কয়েকটি বড় ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যেসব বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। মালিকানা ও পরিচালনায় আকস্মিক পরিবর্তন, কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার, বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণে অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এসব অভিযোগ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলেছে: ইসলামী ব্যাংকগুলো কি সত্যিই নিরাপদ হাতে আছে?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব অনেক গভীর। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো আস্থা। একটি ব্যাংকের মূলধন, ভবন বা প্রযুক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের বিশ্বাস। মানুষ যদি মনে করে তাদের আমানত নিরাপদ নয়, তাহলে যে কোনো সময় আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, একটি গুজব বা আস্থাহীনতাই ব্যাংককে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মানুষ একযোগে টাকা তুলে নিতে শুরু করলে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংকও সংকটে পড়তে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ এখানে বিপুলসংখ্যক সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের আমানত বিদ্যমান।
সরকারকে এ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে যে, ইসলামী ব্যাংকিং সংকটকে সাধারণ মানুষ কেবল আর্থিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন না; অনেকেই এটিকে বিশ্বাস ও নৈতিকতার সংকট হিসেবেও দেখেন। ফলে এখানে ভুল বার্তা গেলে তার রাজনৈতিক অভিঘাতও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যখন জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাজনৈতিক আশ্রয়ে ব্যাংকিং খাতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে, তখন রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতে ধীরগতি এবং খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে নতুন কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে। বিশেষত প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ ইসলামী ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসে। ফলে এই খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকিংকে পেশাদার আর্থিক খাত হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ অনুমোদন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত কিংবা শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে আনুগত্য ও প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হলে তার ফল কখনোই ভালো হয় না। ব্যাংক তখন ধীরে ধীরে অর্থনীতির উন্নয়নের অংশীদার না হয়ে কিছু গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
এখানে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে নয়, রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে যদি কেবল নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিচালিত করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মূল সমস্যা সমাধান না করা হয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। জনগণ এখন শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; প্রকৃত সংস্কার দেখতে চায়।
প্রথমত, ইসলামী ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা, তারল্য পরিস্থিতি ও খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে। গোপনীয়তা ও ধামাচাপার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপজ্জনক। মানুষ যখন তথ্য পায় না, তখন গুজব ও আতঙ্ক আরও দ্রুত ছড়ায়।
দ্বিতীয়ত, যেসব ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার বা করপোরেট দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ক্ষুদ্র খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রভাবশালীদের রক্ষা করা হলে জনগণের আস্থার সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত চাপের বাইরে থেকে যাতে তারা ইসলামী ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সমানভাবে নজরদারি করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
চতুর্থত, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মৌলিক দর্শন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য কেবল নামের আগে “ইসলামী” শব্দ ব্যবহার নয়; বরং ব্যবসাভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক ও ঝুঁকি ভাগাভাগির অর্থনীতি গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ইসলামী ব্যাংকও অতিরিক্ত বন্ধকনির্ভর, করপোরেট সুবিধাভোগী ও কাগুজে শরিয়াহ ব্যবস্থায় আটকে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই হতাশার জন্ম নিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রকৃত শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, দক্ষ শরিয়াহ বোর্ড এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ নীতি নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারকে বুঝতে হবে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু অর্থনীতির সংকট নয়; এটি জনআস্থার সংকট। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে তার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত গড়ায়। ইতিহাস বলছে, অনেক সময় অর্থনৈতিক সংকটই রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা করেছে।
এখনও সময় আছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সাহসী, স্বচ্ছ ও পেশাদার সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক বিবেচনা, গোষ্ঠীগত স্বার্থ কিংবা সাময়িক সমাধানের পথে হাঁটলে হয়তো কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সংকট আরও বিস্ফোরক রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে দ্রুত আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই খাতের অনিশ্চয়তা শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই নয়, সরকারকেও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।
মো: মুখলেছুর রহমান।
[ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার]
mukhles1975@gmail.com