
বিশ্ব আজ প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির যুগে প্রবেশ করেছে। মানুষ চাঁদে যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজীবনের নানা ক্ষেত্র দখল করে নিচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সাফল্য অর্জন করছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে মানবসভ্যতা আরেকটি গভীর সংকটের মুখোমুখি—মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে বিশ্বের ১২০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকীত্ব, আচরণগত জটিলতা কিংবা মানসিক অস্থিরতা এখন শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর গবেষণা বলছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় মানসিক রোগের বিস্তার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষ করে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ও মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে উঠছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীরা।
এই বাস্তবতা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়; এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর সংকটেরও প্রতিফলন। প্রশ্ন হচ্ছে—মানুষ এত উন্নত হলো, কিন্তু কেন মানসিকভাবে এত দুর্বল হয়ে পড়ছে?
আধুনিক জীবনযাত্রার ধরন এর অন্যতম প্রধান কারণ। মানুষ যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, ততই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে পরিবার, সমাজ ও প্রকৃতি থেকে। আগে মানুষ পরিবার, প্রতিবেশী ও সামাজিক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে মানসিক শক্তি অর্জন করত। এখন শহুরে জীবনে মানুষ হাজার মানুষের ভিড়েও একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সংযোগ বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে তা অনেকের ভেতরে তুলনা, হতাশা ও আত্মঅসন্তুষ্টি বাড়িয়ে তুলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকা, ভার্চুয়াল স্বীকৃতির প্রতি অতিনির্ভরতা এবং বাস্তব সম্পর্কের দুর্বলতা মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
একই সঙ্গে আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও মানুষের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের চাপ, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, পারিবারিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মানুষ এক ধরনের অবিরাম মানসিক ক্লান্তির মধ্যে বাস করছে। কোভিড-১৯ মহামারির পর এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। লকডাউন, একাকীত্ব, চাকরি হারানো এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কোটি কোটি মানুষের মানসিক স্থিতি ভেঙে দিয়েছে।
তবে এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে—অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় বা “ওভার-ডায়াগনোসিস”। বর্তমানে সাধারণ দুঃখ, হতাশা বা স্বাভাবিক মানসিক ওঠানামাকেও অনেক সময় দ্রুত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অটিজম বা এডিএইচডি নির্ণয়ের হার দ্রুত বেড়ে যাওয়া নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এখানে ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রশ্নও উঠে আসে। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু সেই সচেতনতা যদি অপ্রয়োজনীয় ওষুধনির্ভর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তাহলে তা নতুন ধরনের বিপদের জন্ম দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সমস্যার সামাজিক বা মানসিক কারণ দূর করার বদলে দ্রুত ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এ নিয়ে সচেতনতা ও চিকিৎসা অবকাঠামো এখনো অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ মানুষ মানসিক সমস্যাকে এখনো “পাগলামি” বা সামাজিক লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখেন। ফলে অনেকে চিকিৎসা নিতে চান না কিংবা সময়মতো সহায়তা পান না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো যথেষ্ট নয়।
অথচ মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি মানসিকভাবে অসুস্থ সমাজ কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। উদ্বিগ্ন, হতাশ ও বিচ্ছিন্ন মানুষ দিয়ে সুস্থ পরিবার, উৎপাদনশীল অর্থনীতি কিংবা মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
এই সংকট মোকাবিলায় শুধু ওষুধ বা হাসপাতাল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ। পরিবারে আন্তরিক সম্পর্ক, শিশুদের প্রতি মানসিক সহায়ক আচরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য ও কলঙ্কমুক্ত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদেরকে আবার মানুষকেন্দ্রিক জীবনদর্শনে ফিরে যেতে হবে। কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা ভোগবাদী সফলতাই মানুষের সুখ নিশ্চিত করতে পারে না। মানুষকে বাঁচতে হলে প্রয়োজন মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক বন্ধন ও জীবনের অর্থপূর্ণতা।
মানসিক স্বাস্থ্য সংকট আজকের বিশ্বের এক নীরব মহামারি। এটি হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরকার স্থিতি ও মানবিকতাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। তাই এখনই যদি পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ একযোগে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতের পৃথিবী প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানুষে মানুষে আরও বিচ্ছিন্ন, ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে উঠবে।
মো: মুখলেছুর রহমান।
[সাবেক সদস্য, পরিচালনা পর্ষদ, ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল রাজশাহী এবং ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন ঢাকা]