
মো: মুখলেছুর রহমান: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে লেবানন বরাবরই একটি ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র। ভৌগোলিক আয়তনে ছোট হলেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য, দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘ সংঘাত এবং বহিরাগত শক্তির প্রভাব—সব মিলিয়ে লেবাননের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও সেই জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে এবং নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, দেশটি কি আরেকটি রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে?
সম্প্রতি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের বিভিন্ন বক্তব্য এবং হিজবুল্লাহর অবস্থানকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব, সশস্ত্র সংগঠনের ভূমিকা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতির প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাস্তবতা হলো, লেবাননের রাষ্ট্রব্যবস্থা বহু বছর ধরেই একটি বিশেষ ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা যায়। কিন্তু এই ব্যবস্থার পাশাপাশি হিজবুল্লাহ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা শুধু লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হিজবুল্লাহর সমর্থকদের মতে, সংগঠনটি ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেবাননের প্রতিরোধের প্রতীক। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাস এবং ২০০৬ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের এই অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি হলো, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো সশস্ত্র শক্তির অস্তিত্ব দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
এই বিতর্ক নতুন নয়। তবে বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি এটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করছে। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও অবস্থান থেকে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে ভেতরে ও বাইরে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে।
লেবাননের ইতিহাস এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। সেই সংঘাত শুধু লেবাননের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল ছিল না; বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যুদ্ধ শেষ হলেও সেই ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি। আজও দেশটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর সেই ইতিহাসের প্রভাব বিদ্যমান।
এ কারণেই বর্তমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ অমূলক নয়। যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেয়, তখন বহিরাগত শক্তিগুলো প্রায়ই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য। ফলে লেবাননের রাজনৈতিক মতপার্থক্য যদি আরও গভীর হয়, তাহলে তা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণও হতে পারে।
একই সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। উভয় পক্ষের কড়া বক্তব্য, সামরিক প্রস্তুতি এবং পারস্পরিক হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। এ ধরনের উত্তেজনা কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং মানবিক পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংযম। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সামরিক সংঘাতে রূপ দেওয়া কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়। লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উচিত জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংলাপ ও সমঝোতার পথ খোঁজা। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোরও উচিত নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে লেবাননকে ব্যবহার না করা।
আজকের বিশ্বে একটি দেশের স্থিতিশীলতা শুধু সেই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং পুরো অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশটি যদি নতুন করে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুতরাং এখন সময় উত্তেজনা নয়, সংলাপের; বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্যের; সামরিক সমাধান নয়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যুদ্ধের মাধ্যমে হয়তো সাময়িক বিজয় অর্জন করা যায়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কেবল রাজনৈতিক সমঝোতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই।
মো: মুখলেছুর রহমান।
[আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক, অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী]