
ফিরোজ মাহবুব কামাল
আগ্রহ নাই আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে বাঁচায়
নবী রাসূলগণের মূল কাজটি ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার দেয়া কুর’আনী রোডম্যাপকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া। মানব কল্যাণে এটিই হলো মহান রব’য়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। পানহার তিনি পশু পাখিকেও দেন; কিন্তু জান্নাতের নেয়ার প্রকল্পটি একমাত্র মানবের জন্য। নবী রাসূলগণ আর আসবেন না। তাদের কাজের দায় প্রতিটি ঈমানদারের। এবং সেটিই হলো খেলাফতের দায়। ইবাদতকে শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতে ও তাসবিহ তাহলিলে সীমিত রাখলে সে দায় কখনোই পালিত হয়না। তখন সত্যিকার পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার কাজটিও হয় না। কুর’আনী রোডম্যাপ যারা নিজেরা অনুসরণ করে এবং অন্যদেরও সে পথে চলতে সাহায্য করে -বুঝতে হবে তারা পালন করছে খেলাফতের দায়িত্ব। খেলাফতের দায়িত্ব পালনের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ এ পৃথিবী পৃষ্ঠে নেই; এর চেয়ে মর্যাদাকর কোন দায়িত্বও নাই। বুঝতে হবে, খলিফার দায় ছাড়া অন্য কোন কারণে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। পার্থিব এ জীবনকে আনন্দময় করার জন্য ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, উন্নত যাতায়ত ব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ এবং স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব আছে; তবে এগুলি জান্নাতে নেয় না। জান্নাতে পেতে হিসাব হয়, খেলাফতের দায় কতটুকু সুষ্ঠ ভাবে পালিত হলো -সেটি। সে দায় পালনে নিয়োগ করতে হয় নিজের মেধা, অর্থ, শ্রম ও রক্তের। আজকের মুসলিমদের এখানেই বিশাল ব্যর্থতা। তারা নামাজী, রোজাদার ও হাজী রূপে বাঁচতে চায়, কিন্তু রাজী নয় মহান রবয়ের খলিফা রূপে বাঁচতে। কারণ খলিফা রূপে বাঁচতে হলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ নিয়ে বাঁচতে হয় । তখন নিয়ত থাকতে হয় আল্লাহর পথে পথে জিহাদে শহীদ হওয়ার। ঈমানদারকে যে বিশেষ নিয়েত নিয়ে আমৃত্যু বাঁচতে হয়, সেটি মহান রব শিখিয়ে দিয়েছেন নিচের আয়াতে:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: “আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কোরবাণী এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে।” –(সুরা আনয়াম ১৬২)।
প্রতিটি ব্যক্তির ন্যায় প্রতিটি শাসককেও বাঁচতে মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে। মুসলিম উম্মাহর ব্যর্থতার শুরু আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনে মুসলিম শাসকদের ব্যর্থতা থেকে। আল্লাহর খলিফা হওয়ার ব্যর্থ হওয়ার অর্থ, নিজের নফস বা শয়তানের খলিফা হওয়া। এরাই নিজের নফস বা শয়তানকে খোদা বানিয়ে নেয় -সে কথাটি এসেছে পবিত্র কুর’আনে। এমন শাসকদের ব্যর্থতা ও গাদ্দারী সংক্রামিত হয় জনগণের স্তরে। শাসকদের সে গাদ্দারীটি যেমন জনগণের সাথে, তেমনি মহান রব’য়ের সাথে। যে ওয়াদা দিয়ে তারা ভোট নেয়, সে ওয়াদা তারা পালন করেনা। নিজেদের মুসলিম রূপে দাবি করলেও তারা খেলাফতের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা অনুসরণ করে না নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নতকে।
নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণের বিষয়টি কোন মামূলি বিষয় নয়; নবীজী (সা:)কে অনুসরণ করার অর্থ আল্লাহকে অনুসরণ করা। মহান রব’য়ের সে বয়ান এসেছে সুরা নিসার ৮০ নম্বর আয়াতে। সে আয়াতের মাঝে অব্যক্ত অন্য যে বার্তাটি রয়েছে তা হলো, যারা নবীজী (সা:)’য়ের অনুসারী নয়, তারা অনুসারী নয় মহান আল্লাহর। এরাই অনুসারী হয় শয়তানের। এ পৃথিবী পৃষ্ঠে পথ মাত্র দুটি: একটি মহান আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা জান্নাতের পথ -এটিই সিরাতাল মুস্তাকীম। অপরটি শয়তানের দেখানো পথ তথা জাহান্নামের পথ। এ ছাড়া তৃতীয় কোন পথ নাই। তাই যারা আল্লাহর পথে নেই, বুঝতে হবে তারা যে নিশ্চিত চলছে শয়তানের পথে তথা জাহান্নামের পথে। কিন্তু সে মৌল বিষয়টি বুঝাার সামর্থ্য ক’জনের? সে সামর্থ্য না থাকাতে জীবন যাপন, উপার্জন, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, যুদ্ধ বিগ্রহ ও সংস্কৃতির অঙ্গণে যে পথ অনুসরণ করেছে সেটি যে নিশ্চিত জাহান্নামের পথ -সে হুশও তাদের নাই। সেটি বুঝা যায়, তারা যখন নির্বাচনে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও জাতীয়তাবাদীকে। সেটি আরো বুঝা যায়, যখন এরা যুদ্ধ করে এবং চাকর বাকরের ন্যায় শ্রম দেয় ও সেবা দেয় রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র বাঁচাতে। বস্তুত তাদের কারণেই পরাজিত হচ্ছে ইসলাম এবং বিজয়ী হাচ্ছে শয়তানের এজেন্ডা।
শাসকদের নাশকতা
শাসকদের ধর্ম হলো, তারা যে পথের পথিক, দেশবাসীকেও তারা সে পথে নিতে চায় -এমন কি জোর করে হলেও। নিজ শাসনের স্থায়িত্বের জন্য সেটিকে তারা জরুরি মনে করে। তাই শাসক নাস্তিক কম্যুনিস্ট হলে দেশবাসীকেও তারা নাস্তিক কম্যুনিস্ট বানাতে চায়। রোমান রাজা কন্সট্যান্টটাইন খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর তার সাম্রাজ্যের সকল প্রজাদের খৃষ্টান হতে বাধ্য করে। খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়ার পর একই ভাবে জোর পূর্বক খৃষ্টান বানিয়েছে রাশিয়ার রাজা জার। ভারতের পৌত্তলিক শাসকগণও তাই ভারতকে শুধু পৌত্তলিকদের দেশ রূপে গড়ে তুলতে। এজন্যই মুসলিমদের নির্মূল চায়। একই নীতি হলো ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের। তারা ক্ষমতায় গেলে দেশবাসীকে জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্ট বানাতে চায়। ইসলামের প্রতিটি শত্রুপক্ষের কাজ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেলে তারা রাষ্ট্রের সকল প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে ব্যয় করে জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার কাজে। এজন্যই অনৈসলামী রাষ্ট্রের বিপদটি ভয়াবহ; বিপদটি জাহান্নামে পৌঁছার। পৃথিবী পৃষ্ঠে অনৈসলামী রাষ্ট্রই হলো সবচেয়ে ক্ষতিকারক প্রতিষ্ঠান। দেশের পতিতা পল্লীগুলি বহু লোককে জাহান্নামে নেয়, কিন্তু সবাইকে জাহান্নামে নেয়ার সামর্থ্য সেগুলির থাকে না। কারণ জনগণ তাদের হাতে জিম্মি নয়। কিন্তু জনগণ জিম্মি শাসকদের কাছে। আর অনৈসলামী রাষ্ট্রের অঘোষিত রাষ্ট্রীয় নীতি হলো দেশবাসীকে জাহান্নামে নেয়া। সেটি স্কুল কলেজে কুর’আন ও হাদীস শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে এবং ডারউইন, মার্কস, ফ্রয়েডের ন্যায় কাফিরদের নানা কুফুরি মতবাদে ছাত্রদের দীক্ষা দিয়ে। নানা রূপ জাহিলী মতবাদে আক্রান্ত হওয়ায় খোদ রাষ্ট্র পরিণত হয় জাহান্নামের বাহনে। ফলে জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীমে যেতে হলে শর্ত হলো এরূপ রাষ্ট্রের বন্দিদশা থেকে মুক্তি।
এজন্যই এ পৃথিবীপৃষ্ঠে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল হলো বেঈমান শাসকদের নির্মূল। কারণ, এরাই শয়তানের খলিফা। তাদের নির্মূলে দেশের কোটি কোটি নাগরিকদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কাজটি সহজ হয়ে যায়। মহা কল্যাণকর এ কাজটি কখনোই ওহীর জ্ঞানশূণ্য জাহিলদের দিয়ে হয়না, সে কাজের জন্য চাই, কুর’আনের জ্ঞানে আলোকিত সৈনিক। সেনাদলের প্রতিটি সৈনিকের জীবনে যেমন যুদ্ধের প্রস্তুতি ও যুদ্ধ থাকতে হয়, তেমনি জিহাদ থাকতে হয় প্রতিটি ঈমানদারের জীবনে। জিহাদ থাকতে হয় যেমন জাহিলিয়াতের নির্মূলে, তেমনি জাহেল শাসকদের নির্মূলে। নবীজী (সা:) তাই মহান আল্লাহ তায়ালার অধিকৃত ভূমিকে শত্রুমূক্ত করতে দেশে দেশে শুধু মুজাহিদদেরই পাঠাননি, জনগণকে জাহিলিয়াতের নির্মূলে কুর’আনের শিক্ষকও পাঠিয়েছেন। তখন বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ এবং সশস্ত্র জিহাদ একত্রে চলেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, মুসলিম সে ইসলাম নিয়ে বাঁচে না।
ফিতনার নাশকতা: খেলাফতের বিলুপ্তি ও রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
মুসলিম উম্মাহর বিপর্যের শুরু হয় তখন থেকেই যখন মুসলিম দেশের শাসকগণ মনযোগী হয়েছে শুধু রাজস্ব সংগ্রহ, রাজ্য বিস্তার ও ক্ষমতার দাপট নিয়ে বাঁচতে এবং উপেক্ষা করেছে নবীজী (সা:)’য়ের অনুকরণে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে। চরম ভাবে উপেক্ষা করেছে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলায় এবং জনগণের সামনে সে পথটিকে দৃশ্যমান করায়। সে সাথে গড়ে তুলেছে বিচিত্র নামের জাহান্নামের পথ। মুসলিম নামধারী এসব স্বৈরশাসকদের কাছে অনুকরণীয় আদর্শ গণ্য হয়েছে নবীজী (সা:)’য়ের বদলে রোমান ও পারসিক সম্রাটগণ। এসব স্বৈরশাসকগণ কাফির শাসকদের অনুকরণে প্রতিষ্ঠা দেয় রাজতন্ত্রের। খেলাফায়ে রাশেদার আমলে কোন প্রাসাদ গড়া হয়নি, খলিফাগণ মাটির ঘরে বাস করেছেন। প্রাসাদ গড়া শুরু হয়েছে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর।
খেলাফতে রাশেদাকে বিলুপ্ত করে রাজতন্ত্রের জন্ম দেয় হযরত মুয়াবিয়া(রা:)। তিনি তাঁর দুর্বৃত্ত পুত্র ইয়াজিদকে শাসকের সে আসনটিতে বসিয়েছিলেন যে আসনে বসেছিলেন নবীজী (সা;). হযরত আবু বকর (রা:), হযরত ওমর (রা:), হযরত ওসমান (রা:) ও হযরত আলী (রা:)’য়ের ন্যায় মহান ব্যক্তিগণ। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এতবড় বিশাল অপরাধের সংঘটক হওয়া সত্ত্বেও সুন্নীদের কাছে হযরত মুয়াবিয়া(রা:) একজন সম্মানিত ব্যক্তি। সুন্নী আলেমদের মাঝে তাঁর সে অপরাধ কর্ম এতোটা আলোচিত হয়না। এমন কি আলোচিত হয়না উমাইয়া শাসকদের অপরাধকর্মগুলিও। তাদের আমলে জুম্মার খুতবায় থাকতো হযরত আলী (রা:), হযরত হাসান (রা:) ও হযরত হাসান (রা:)’য়ের প্রতি গালি-গালাজ ও অভিসম্পাত। পবিত্র ক্বাবাতে মক্কার কাফিরগণও কখনো আগুন দেয়নি, কিন্তু আগুন দিয়েছে হযরত মুয়াবিয়া(রা:)’য়ের বংশধর উমাইয়া শাসকগণ। সেটি ৬৩ হিজরীতে (৬৮৩ খৃষ্টাব্দে)। মক্কার কাফিরগণ মুসলিম নারীদের উপর ধর্ষণে নামেনি। কিন্তু মদিনার বুকে কয়েক দিন যাবত মুসলিমদের হত্যা ও নারীদের উপর ধর্ষণে নেমেছিল উমাইয়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা। মদিনা নগরীকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়। কয়েক দিনের জন্য মদিনার বুকে লুট তরাজ, খুন খারাবী ও ধর্ষণের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়। মুসলিম ইতিহাসের এটি কালো অধ্যায়। ইতিহাসে মক্কা ও মদিনার উপর উমাইয়া বাহিনীর এ যুদ্ধ হাররাহ’র যুদ্ধ নামে পরিচিত। উমাইয়া আমলে সে কদর্য ইতিহাস সৃষ্টির কারণ, তারা সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, ধরেছিল শয়তানের পথ। এ থেকে বুঝা যায়, ইসলাম ও উম্মাহর শত্রুরা শুধু কাফির পরিবারে জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় মুসলিম নামধারী পরিবারেও। এরাই মুসলিমদের ঘরের শত্রু। মুসলিম উম্মাহর বড় বড় ক্ষতিগুলি সংঘটিত হয়েছে এই ঘরের শত্রুদের হাতে। খেলাফতে রাশেদার বিলুপ্তি কোন কাফিরদের হাতে হয়নি, বরং হয়েছে মুয়াবিয়া (রা:)’য়ের ন্যায় একজন সাহাবীর নে।তৃত্বে।
ইসলামে হারাম হলো আমিরুল মুমিনের বিরুদ্ধ অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ। এটি কবিরা গুনাহ। এটি ফিতনা। ফিতনার মূল লক্ষ্য ইসলামী শাসন, পূর্ণ ইসলাম পালন, সামাজিক শান্তি ও সম্পৃতিকে অসম্ভব করা। মহান আল্লাহ তায়ালা ফিতনাকে মানব হত্যার চেয়েও গুরুতর অপরাধ বলেছেন। সে ঘোষণা এসেছে সুরা বাকারার ২১৭ নম্বর আয়াতে। ফিতনা সৃষ্টিকারীদের শাস্তি তাই মৃত্যুদণ্ড। কারণ, তাদের নির্মূল করা না গেলে ইসলামী শাসন বাঁচেনা। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করতে হলে শুধু আগ্রাসী বিদেশী শত্রু, চোর ডাকাত, প্রতারক, খুনি, ধর্ষকদের শাস্তি দিলে চলে না, শাস্তি দিতে হয় তাদেরও যারা মিথ্যা দর্শন, মিথ্যা ধর্ম ও মিথ্যা মতবাদের জালে ফেলে ও প্রতারণা করে মানুষকে জাহান্নামে নেয়। কারণ, এটি গুরুতর অপরাধ। শাস্তি দিতে হয় তাদেরও যারা ইসলামী রাষ্ট্রের আমিরুল মু’মিনুন বা খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এমন বিদ্রোহের লক্ষ্য ইসলামী রাষ্ট্রকে ব্যর্থ করে দেয়া। ইসলামে এমন বিদ্রোহ হারাম। এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু তাঁর নিজের ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন আমিরুল মু’মিনুন বা খলিফার আনুগত্যকে। এ প্রসঙ্গে মহান রব’য়ের নির্দেশ হলো:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহকে, রাসূলকে এবং তোমাদের মধ্যে যারা হুকুমদাতা (খলিফা, আমিরুল মু’মিনুন) তাদেরকে। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে এটাই উত্তম।”-(সুরা নিসা, আয়াত ৫৯)।
ইসলামী রাষ্ট্রের আমিরুল মু’মিনুন তথা খলিফার প্রতি আনুগত্য না থাকলে সে রাষ্ট্র বাঁচে না। তখন বাঁচে না মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত আবরু। মর্যাদার সুরক্ষায় ইসলামী রাষ্ট্রের বিকল্প নাই। খলিফা হযরত আবু বকর (রা:)’য়ের আমলে বিপুল সংখ্যক মুসলিম বিদ্রোহ করেছিল। তারা রাষ্ট্রীয় তহবিলে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। সে যাত্রায় ইসলামী রাষ্ট্র বেঁচে গিয়েছিল -কারণ হযরত আবু বকর (রা:) শক্ত হাতে সে বিদ্রোহ দমনে সফল হয়েছিলেন। অথচ খেলাফত বাঁচেনি যখন হযরত আলী (রা:)’য়ের শাসনামলে। কারণ তিনি বিদ্রোহে দমনে ব্যর্থ হন।
তবে বিদ্রোহ দমনে হযরত আলী (রা:)’য়ের ব্যর্থ হওয়ার কারণও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছেন হযরত আয়েশা (রা:)’য়ের মত উম্মুল মু’মিনিন এবং হযরত তালহা (রা:) ও হযরত যুবায়ের (রা:)’য়ের মত উঁচু মরতাবার সাহাবী। তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল বিপুল সংখ্যা সাহাবী ও তাবে’য়ী। সেদিন বিদ্রোহীদের কাছে হযরত ওসমান (রা:)’য়ের হত্যার বিচার গুরুত্ব পেয়েছিল, কিন্তু গুরুত্ব পায়নি খেলাফায়ের রাশেদা বাঁচিয়ে রাখার বিষয়টি। সে বিদ্রোহের কারণে হযরত ওসমান (রা:)’য়ের হত্যার বিচার যেমন হয়নি, তেমনি খেলাফায়ে রাশেদাও বাঁচেনি। সে বিদ্রোহে বিজয়ী হয় খেলাফায়ে রাশেদাকে বিলুপ্ত করার শয়তানী প্রকল্প। ইসলামের বিরুদ্ধে এ বিশাল নাশকতার কাজে কোন পৌত্তলিক কাফির, ইহুদী বা খৃষ্টানকে নামতে হয়নি। শয়তান বিজয় পেয়েছে মুসলিমদের শ্রমদানে ও রক্তদানে। এ আত্মঘাতী ফিতনার পরিণতি হলো, মুসলিম উম্মাহর ঘাড়ে চেপে বসে উমাইয়া বংশের নৃশংস রাজতন্ত্র। এবং নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্বের বদলে চেপে বসে উমাইয়াদের আরব বর্ণবাদ ও গোত্রবাদ। এর পর মুসলিম উম্মাহও এক থাকেনি; সে বিভেদ থেকেই শুরু হয় শিয়া সূন্নীর বিভেদ। উত্থান ঘটে খারেজীদের। ফিতনা দমনে ব্যর্থ হলে এভাবেই সে ফিতনা ডাল পালা নিয়ে বেড়ে উঠে। যে বিভেদকে আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন, সে বিভক্তি নিয়ে বাঁচাটি মুসলিমদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিতে পরিণত হয়। ফলে খেলাফলে রাশেদার আমলে ইরানীদের ন্যায় অনারব জনগণের মাঝে ইসলাম কবুলের যে জোয়ার শুরু হয়েছিল তা উমাইয়াদের আরব বর্ণবাদ ও গোত্রবাদের তাণ্ডবে থেমে যায়। সে জোয়ার আবার শুরু হয় উমাইয়া শাসন নির্মূলের পর।
ঘরে ঘরে আগুন দিলে বা সকল সম্পদ কেড়ে নিলেও মুসলিম উম্মাহর এতো বড় ক্ষতি হয় না, যা হয় ফিতনা জনিত বিভক্তির কারণে। বিভক্তি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের শাস্তি দেয়াটি কঠিন হয়ে পড়ে যখন মুসলিম দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা সংস্কৃতিতে বিজয়ী হয় ইসলামের শত্রুপক্ষ। কারা তারা নিজেরা সে অপরাধের অংশ। তখন রাষ্ট্রের বুকে নানা মতবাদের নামে যে পথগুলি বিশাল আকারে দৃশ্যমান হয় ও চোখ ধাঁধিয়ে দেয় -তা হলো শয়তানের সৃষ্ট জাহান্নামের পথ। সেগুলিকে সাফল্যের পথ রূপ তুলে ধরা হয়। এরূপ জাঁকজমকপূর্ণ পথের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ দূরে থাক, এমনকি নবেল প্রাইজ বিজয়ী মহাপন্ডিতগণও সত্যপথ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। ভারতের বুকে সে ব্যর্থতাটি সহজেই চোখে পড়ে যখন সে দেশটির সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী প্রফেসর, বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞানীগণও পৌত্তলিকতার সনাতন অজ্ঞতা নিয়ে বাঁচে ও তা নিয়ে গর্ব করে। তাদের অনেকে আবার গরুকে ভগবান বলে এবং গোমুত্র সেবন করে। জনগণের স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে তাদেরকে যেমন ভূয়া ঔষধব্যবসায়ী থেকে বাঁচাতে হয়, তেমনি জাহান্নামের পথ থেকে বাঁচাতে হলে ভূয়া ধর্মপ্রচারকদের থেকেও বাঁচাতে হয়। নবীজী ও খোলাফায়ের রাশেদা তাই আরব ভূমিকে পৌত্তলিক ও ইহুদি ধর্মব্যবসায়ীদের থেকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে বিজয় পেয়েছে নানা ফেরকা, ত্বরিকা ও দলের নামে ধর্মব্যবাসীয় ফেতনাসৃষ্টিকারীরা। তাদের কাছে মুসলিমদের একতা, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ এবং মুসলিম উম্মাহকে একটি বিশ্বশক্তি রূপে গড়ে তোলা কোন এজেন্ডা নয়। তারা ব্যস্ত নিজেদের দলীয় এজেন্ডাকে বিজয়ী করা নিয়ে। ০৬/০৬/২০২৬