
সাইফুল ইসলাম সুমন, কুমিল্লা: কুমিল্লা নগরীর বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় ও আশপাশের এলাকায় বহুতল ভবনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে সেই তুলনায় গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা। শপিং মল, অফিস, হোটেল ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আগত মানুষের গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় সড়কেই পার্কিং করতে হচ্ছে। এর ফলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি পরিকল্পিত নগরীর জন্য ভবনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কুমিল্লা নগরীর অধিকাংশ বাণিজ্যিক বহুতল ভবনে এ সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে শপিং মল, অফিস ও হোটেলসমৃদ্ধ ভবনগুলোর বেশিরভাগেই পর্যাপ্ত গ্যারেজ নেই। ফলে ক্রেতা, দর্শনার্থী, অফিসগামী ব্যক্তি এবং হাসপাতালের রোগী ও তাদের স্বজনদের গাড়ি রাস্তার ওপরই রাখতে হয়।
অন্যদিকে আবাসিক ভবনগুলোর অধিকাংশে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে এ সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে দিনের ব্যস্ত সময়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো কার্যত অস্থায়ী পার্কিং জোনে পরিণত হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কান্দিরপাড় কেন্দ্রিক এলাকায় মোট ২০টি বহুতল ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি ভবন নির্মাণাধীন। বিদ্যমান ভবনগুলোর মধ্যে মাত্র ১০টিতে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ভবনেই কোনো ধরনের পার্কিং সুবিধা নেই।
কান্দিরপাড়-টমছমব্রিজ সড়কের দুই পাশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩১টি বহুতল ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ভবন নির্মাণাধীন। অথচ পুরো সড়কে মাত্র ৩টি ভবনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে প্রতিদিন অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
একই চিত্র কান্দিরপাড়-রাজগঞ্জ সড়কেও। এ সড়কের দুই পাশে ১৪টি বহুতল ভবনের মধ্যে একটি নির্মাণাধীন। তবে মাত্র ৫টি ভবনে পার্কিং সুবিধা রয়েছে। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ক্রেতাদের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজটও বাড়ছে।
অপরদিকে কান্দিরপাড়-পুলিশ লাইনস সড়কের দুই পাশে ২১টি বহুতল ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একটি ভবন নির্মাণাধীন এবং ১১টি ভবনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য এলাকার তুলনায় এ সড়কে কিছুটা বেশি পার্কিং সুবিধা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনও অপ্রতুল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কান্দিরপাড় কেন্দ্রিক যেসব ভবনে আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই পুরো জায়গা পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয় না। কোনো কোনো ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডের একপাশে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকলেও অন্যপাশে জুয়েলারি দোকান, কাঁচাবাজার কিংবা বিভিন্ন পণ্যের শোরুম স্থাপন করা হয়েছে। ফলে পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দকৃত স্থান আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সড়কের পাশে এলোমেলোভাবে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যায়। এতে সামান্য চাপেই যানজট তৈরি হয়। বিশেষ করে ছুটির দিন, উৎসব মৌসুম এবং সন্ধ্যার পর যানজটের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
নগরবাসীর দাবি, নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাণিজ্যিক ভবনগুলোর পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থাপনা ছাড়া একটি আধুনিক নগরীর টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই কুমিল্লা নগরীর কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বহুতল পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান ভবনগুলোতে পার্কিং নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় দিন দিন যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্কিং সংকট ও যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
সমাজকর্মী আলী আকবর মাসুম বলেন, নগরীর শৃঙ্খলা ও যানজট নিরসনে সিটি কর্পোরেশন যেসব শর্ত ও বাধ্যবাধকতা দিয়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে, অনেক ভবন মালিক তা মানেননি। ফলে গ্যারেজ ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যারেজবিহীন ভবনের মালিকদের পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সায়েম ভূঁইয়া বলেন, ভবন নির্মাণের জন্য যে নকশা ও অনুমোদন দেওয়া হয়, বাস্তবে অনেক মালিক তা অনুসরণ করেন না। আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক উভয় ধরনের ভবনেই যেখানে গ্যারেজ থাকার কথা, সেখানে অনেকেই দোকান বা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ভাড়া দিয়ে রাখেন।
তিনি জানান, এসব ভবনের মালিকদের অফিসিয়ালভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে যাতে গ্যারেজগুলো গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে ভবন মালিকদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।