
ডেস্ক রিপোর্ট: রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারের পাশাপাশি পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। অন্যথায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।
রোববার রাজধানীতে সেন্টার ফর মিডিয়া ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি আয়োজিত “তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও লেখক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই প্রত্যাশা উপেক্ষা করছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ৩১ দফার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন। ক্ষমতায় আসার পর তারা সেই অঙ্গীকার থেকে সরে গেছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ না নেওয়াকে তিনি সরকারের অনীহার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সেমিনারে সেন্টার ফর মিডিয়া ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসির পরিচালক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, সরকার এখন সংস্কারের কথা উচ্চারণ করতেও অনাগ্রহী। রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দলীয়করণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও দখলবাজির সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে বলেই সরকার এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি তথ্য ও সম্প্রচার খাতসহ পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে আবুল আসাদ বলেন, দেশের মানুষ গণমাধ্যমের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সময়ই গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। তিনি জানান, দীর্ঘ ৫৪ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অধিকাংশ সময়ই তিনি পূর্ণ বেতন পাননি। সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত মান ক্ষুণ্ন করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. খাদিমুল ইসলাম। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের পরিচালক জাহিদুর রহমান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে একুশে টিভির হেড অব নিউজ হারুনুর রশিদ বলেন, সরকার ও রাষ্ট্র এক বিষয় নয়। সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারই শতভাগ স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
গ্রীন ওয়াচ বিডির সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার সাংবাদিকদের স্বল্প বেতন ও জীবনমানের সংকটের কথা তুলে ধরে গণমাধ্যম সংস্কারে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে এবং সেই প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, বিগত ১৫ বছরে সাংবাদিকদের অনেকেই নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো এবং সাংবাদিকতার পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুর্নীতির অর্থে প্রতিষ্ঠিত মালিকানার প্রভাব এবং সাংবাদিকদের অপ্রতুল বেতন গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক মহাপরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রফিক রুম্মানসহ গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।