
আরিফুল হক: বর্তমান অখন্ড ভারত, অর্থাৎ( ভারত , পাকিস্তান , বাংলাদেশ)এর সম্মিলিত মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন । যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মুসলিম জনঅধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে পরিচিত।
ভারতের কেরালা রাজ্যে ৬২৯ খৃষ্টাব্দে নির্মিত চেরুমন জুম্মা মসজিদ প্রমান করে যে ইসলামের আবির্ভাবকাল থেকেই ভারতে মুসলমানদের বসবাস । অর্থাৎ রাসূল (সঃ) জীবদ্দশা থেকেই ভারতের গণমানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া শুরু করে । সুতরাং বর্তমান হিন্দুত্ববাদীরা ভারতীয় মুসলমানদের বিদেশি বা আগ্রাসী শক্তি হিসাবে যে প্রচার চালাচ্ছে তা মিথ্যা, ভিত্তিহীন , এবং রাজনৈতিক দূরভিসন্ধিভূলক।
হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়রা জন্মগতভাবে সাম্প্রদায়িক । কারন তারা বর্ণবাদে বিশ্বাসী । তারা নিজের জাতিকে ব্রাম্ভ্রন , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য , শূদ্র চার ভাগে ভাগকরে রেখে এক বর্ণ অন্য বর্ণকে নীচু মনে করে । মানুষ হয়ে জন্মগ্রহনের পরও তারা মানুষকে ঘৃনা ছাড়া, বালবাসা দিতে শেখেনি । অখন্ড ভারতের ২৫% মুসলমানকে আপন করে নেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা ,এমনকি তাদের ভারতীয় জাতি হিসাবে স্বীকৃতি দিতেও কার্পন্য করেছে । এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ লেখার অবকাশ নেই শুধু দু একটা ভারতীয় নেতার উক্তি তুলে ধরাই যথেষ্ট মনেকরি।
১) হিন্দু মুসলিম মিলন কে ‘অপবিত্র’ আখ্যায়িত করে ভারতীয় জাতির জনক গান্ধী বলেছিলেন—‘ হিন্দু মুসলিম ঐক্য হইত ইতর প্রকৃতির মানুষের এক দঙ্গলের হাতে ভারতবর্ষকে সমর্পন করার সমান । ভারতবর্ষের দূর্ভাগ্যের সেই চরম পরিনতি প্রত্যক্ষ করিবার জন্য আমি ১২৫ বৎসর পর্যন্ত বাঁচিতে ইচ্ছা করিনা ‘।(হরিজন ৭ এপ্রিল ‘৪৬ )
২) নেহেরু বলতেন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সমস্ত এলাকা একদিন ভারতের একছত্র দখলে চলে আসবে, তখন স্বাধীন রাষ্ট্রসত্বা নিয়ে কোন সংখ্যালঘু জাতি টিকে থাকবেনা’।
৩)কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত বাংলা সাহিত্যে নামকরা কবি । তিনি মুসলমানদের কি চোখে দেখতেন তার একটা নমুনা দেখুন ।
“ দিশি পাতি নেড়ে যারা তাতে পুড়ে হয় সারা
ম’লাম মলাম মামু কয় ।
হ্যাদু বাড়ি খ্যানু ব্যাল প্যাটেতে মাখিনু ত্যাল
রাতি তবু নিদ নাহি হয় ।
এ্যঁদে দ্যায় ফুফু নানী কলুই ডেলের পানি
ক্যাঁচা কেলা কচুর ছালন “।
এই কবির চোখে মুসলমানরা এতই নিম্নস্তরের জাতি যে ভালভাবে কথা বলতেও জানেনা ।
৪) আসুন এবার সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র কি
বলে দেখা যাক।
“হিন্দুজাতি ভিন্ন পৃথিবীতে অনেক জাতি আছে । তাহাদের মঙ্গল মাত্রেরই আমাদের মঙ্গল হওয়া সম্ভব নহে। অনেক স্থানে তাহাদের মঙ্গলে আমাদের অমঙ্গল । যেখানে তাহাদের মঙ্গলে আমাদের অমঙ্গল , সেখানে তাহাদের মঙ্গল যাহাতে না হয় আমরা তাহাই করিব”।
পলাশী ট্যাজেডির পর, ইংরেজরা সূর্যাস্ত আইন করে মুসলমাদের জোতদারি, জমিদারি কেড়ে নিয়ে তাদের তল্পীবাহক হিন্দুদের হাতে তুলে দেয় ।সেই তল্পীবাহক হিন্দুরা , জমিদার হয়ে মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন চালায় তার নমুনা দেখা যাক।
প্রথমেই তারা মুসলমানদের শিক্ষার উপর হাত দেয়। আরবী -ফারসী সমৃদ্ধ জনসাধারণের কথ্য ভাষাকে , অবোধ্য সংস্কৃত শব্দবহুল পন্ডিতি ভাষায় রুপান্তরিত করে । পাঠ্যপুস্তক সংস্কার করে , মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থি - মহিমাস্তব’, ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ , ‘ শ্রীকৃষ্ণ রসমঞ্জরী’ , ‘আনন্দ মঙ্গল ‘ প্রভৃতি দেবদেবীর স্তবস্তুতিমূলক প্রবন্ধাদি পাঠ্যপুস্তকে সংযোজিত করে ।
মুসলমানদের বল পূর্বক কালীপুজা , দুর্গাপুজা , দশহরা, লক্ষ্মী পূজা, গনেশ পূজায় অংশ নিতে বাধ্য করে । তহবন পরলে বাড়ীর আঙিনায় ঢুকতে দেয়া হয়না , দাঁড়ি রাখলে গোঁফ ছাটলে খাজনা দিতে হয় । মসজিদ বানালে ১০০০টাকা জমিদারের নজর দিতে বাধ্যকরা হয়। আরবী ফারসী নাম রাখলে ৫০টাকা জমিদারি ফি ধার্য করা হয় ।গরু জবেহ করলে ডানহাত কেটে ফেলার আইন করা হয় ।( যা আজ হিন্দুত্ববাদী ভারতে লক্ষনীয় ) এগুলো গুটিকয়েক নমুনা মাত্র । এমন ভূরিভূরি মুসলিম নির্যাতনের ইতিহাসে ভারতের ইতিহাসকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে ।
এসকল নির্যাতন ,সেদিনের মুসলমানরা বিনা বাধায় মেনে নেয়নি। তারা আগ্রাসী ইংরেজ শক্তি এবং তাদের তল্পিবাহক হিন্দু জমিদার গোষ্ঠীর সাথে দু’শ বছর ধরে দু হাতে লড়াই করেছে ।১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের পর এমন একটা দিনও বাদ যায়নি যখন মুসলমানরা তাদের স্বাধীনতা পুনঃউদ্ধারের লড়াই করেনি। যেমন,১৭৫৮ সালে শাহ আলমের বিহার আক্রমন । ১৭৬০ এ খাদিম হোসেনের পূর্নিয়া বিদ্রোহ । ১৭৬১-৬৪ উধুয়ানালা ও বক্সার যুদ্ধ । ১৭৬৯ ফকির বিদ্রোহ । ১৭৭৮-৭৯ হায়দার আলির উভ্যূত্থান ।১৭৮৭ তে সিলেট বিদ্রোহ ।১৭৯২ টিপু সুলতানের যুদ্ধ । ১৭৯৫ আসাম বিদ্রোহ । ১৭৯৯সালে টিপুসুলতানের মহাবিপ্লব ও শাহাদাত বরন । ১৮০৪ এ হাজী শরীয়তুল্লাহর বিপ্লব। ১৮১৬ বেরেলভীর মুফতি আয়াজের নেতৃত্বে বিপ্লব । ১৮২০-৩১ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর বিল্পব এবং ১৮৩১ বালাকোটের যুদ্ধে শাহাদাত বরন । এরপর আরও ছোট বড় যুদ্ধের পর সংঘটিত হয় ১৮৫৭ সালের মহান সিপাহী বিপ্লব । এই সমস্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের চালিকাশক্তিই ছিল মুসলমানরা।আর তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতভূমিতে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চাওয়ার অধিকার পুঃনপ্রতিষ্ঠিত করা ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গ্রেট ব্রিটেনের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে ।ফলে বৃটিশ লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলী ক্ষমতায় এসে ভারত ছেড়ে দেবার প্ল্যান গ্রহন করেন । সেখানেও ভারতীয় হিন্দু নেতারা মুসলমানদের বঞ্চিত করার কলাকৌশল আঁটতে থাকে !
১৯২৯ সালে এই ঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়ে নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার নেতা বি এস মুঞ্জে ও এন সি কেলকার বলেছিলেন ,’ মুসলমানরা যদি এদেশে থাকতে চায় তাহলে হিন্দুজাতির সংগে লীন হয়ে থাকতে হবে, নতুবা সাতশ বছর বসবাসের পর মুসলমানদের স্পেন থেকে যে ভাবে বিতাড়িত করা হয়েছিল, আমরাও তাদেরকে সেভাবেই আরব সাগর পার করে দেব’।( মুসলিম সমাজের …বেনজির, আবু জাফর শামসুদ্দিন)।
ভারতীয় হিন্দু নেতাদের মুসলিম জণসাধারনের প্রতি এহেন অবজ্ঞা ,ঘৃনা , শত্রুতার শতশত উদাহরণ ইতিহাসে বিধৃত আছে ,(আমি দু একটা তুলেধরলাম মাত্র )। লেখকের নিজের অভিজ্ঞতায় আছে , জুম্মার নামাজের সময়, মসজিদের সামনে মিছিল করে ,ঢাক- ঢোল পিটিয়ে শ্লোগান দিতে আরম্ভ করলো, “ইধার ধরমকা ঝান্ডা গাড়ো , উধার অধর্মী রাহ উখাড়ো”। অর্থাৎ একদিকে (হিন্দু) ধর্মের ঝান্ডা গাড়ো , অন্যদিকে বিধর্মী উচ্ছেদ কর । এগুলোই ছিল ১৪আগষ্ট ৪৭ এর পাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপট ।
আজকের প্রজন্মকে জানতে দেয়া হয়নি যে কোন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের নিজস্ব আবাসভূমির অপরিহার্যতা দেখা দিয়েছিল । কোন পরিস্থিতিতে ১৯২৭ সালে মওলানা হসরত মোহানী ভারতে সতন্ত্র মুসলিম অধ্যূষিত অঞ্চল দাবী উত্থাপনে বাধ্য হয়েছিলেন । সেকালে হিন্দু মুসলমানের মিলনের দূত নামে পরিচিত কায়েদে আজম মহম্মদ আলি জিন্নাহ, কেন বলেছিলেন-“ গান্ধীর উদ্দেশ্য এদেশে হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান এবং হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা”। মিঃ জিন্না মাউন্টব্যটেন কে বলেছিলেন , ‘ ভারতে গণতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে হিন্দু রাজ্য । এ অবস্থা মুসলমানরা মেনে নিতে পারেনা । তিনি ব্যাউন্টব্যাটেন কে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন—“ Frankly, your execellency, the Hindus are impossible . They always want seventeen Annas for the Rupee.( Hector Bolitho )
মূর্খরা যা বলে বলুক , ইতিহাস বলে ভারতের অবহেলিত নির্যাতিত ,শোষিত লাঞ্ছিত মুসলমানের বাঁচার জন্য ৪৭ পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা ছিল । আজকের ভারত ও কাশ্মীরের মুসলিম নিপীড়নের দিকে তাকালেও মনেহয় ৪৭ এ পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজনীতা ছিল ।আজ পশ্চিম এশিয়ার কুর্দিদের দিকে তাকালে মনেহয় পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা ছিল । চীনের উইঘুর দের দিকে তাকালে মন হয় পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজনীযতা ছিল ।ভারতের তপশীল, নাগা, মিজো, কাশ্মীরির দিকে তাকালে মনহয় পাকিস্তান সৃষ্টি সঠিক ছিল ।
সময়ের গোধুলি বেলার মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মুসলমানকে বলতে ইচ্ছে করে, আধিপত্যবাদী ভারতের মধুমাখা বুলীতে ভুলে , ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তোমরা যে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার খুলে দিয়ে মসজিদে অবরুদ্ধ হয়েছ , জানালা খুলে বাইরের কিছু দেখছনা । আমি স্পেনের মুসলমানের মত ভয়ঙ্কর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার আভাস পাচ্ছি । ঐ দেখ রাজা ফার্দিনান্দের মত বাজপা মোদির দল হাততালি দিয়ে বলছে ,এ্যায় মুসলমান! তুমলোগ বুদ্ধু হো , ‘এপ্রিল ফুল’ ।