
২০২৯-এর আগে সবচেয়ে বড় ভোটার গোষ্ঠী হয়ে উঠছে তরুণ প্রজন্ম; বদলে যেতে পারে নির্বাচনী রাজনীতির ভাষা, অগ্রাধিকার ও ক্ষমতার সমীকরণ
বিশেষ প্রতিনিধি: ভারতের গণতন্ত্র এক নীরব কিন্তু ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পর দেশটির রাজনীতিকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করেছে জাতপাত, ধর্ম, গ্রাম-শহরের বিভাজন, আঞ্চলিক পরিচয় এবং অর্থনৈতিক শ্রেণিভিত্তিক ভোটের সমীকরণ। কিন্তু আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক নির্ধারক শক্তি—জেনারেশন জেড (জেন জি)।
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী জেন জি ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। জনমিতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩৮ কোটি। অর্থাৎ প্রতি চারজন ভারতীয় ভোটারের একজনেরও বেশি হবেন এমন নাগরিক, যাদের শৈশব কেটেছে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে।
সংখ্যার বিচারে এটি শুধু একটি জনমিতিক পরিবর্তন নয়; বরং ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রজন্মগত ক্ষমতা হস্তান্তরের সূচনা।
ভারতের নির্বাচন বরাবরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক অনুশীলন। কিন্তু আগামী নির্বাচনগুলোয় ভোটের অঙ্ক কেবল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শেষ হবে না। রাজনৈতিক লড়াইয়ের বড় অংশ নির্ধারিত হবে মোবাইল ফোনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমে এবং ডিজিটাল জনমতের প্রবাহে।
জেন জি এমন একটি প্রজন্ম, যারা রাজনৈতিক ভাষণ টেলিভিশনে নয়, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে বেশি দেখে। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে তথ্য যাচাই, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং জনসম্পৃক্ততাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে শুধু জনপ্রিয় স্লোগান যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য নীতি, দ্রুত জবাবদিহি এবং ডিজিটাল উপস্থিতি।
ভারতের সাম্প্রতিক নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষাকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রথমে ছিল একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তা শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সরকারের সক্ষমতা নিয়ে জাতীয় আলোচনায় রূপ নেয়।
লাখো শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একযোগে সরব হন। অনলাইন প্রচারণা দ্রুত অফলাইনে আন্দোলনের রূপ নেয়। বিষয়টি সংসদ, আদালত এবং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভারতের নতুন প্রজন্ম শুধু ভোট দেয় না—তারা জনমত তৈরি করতে পারে, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং জাতীয় আলোচনার এজেন্ডাও নির্ধারণ করতে পারে।
জেন জিকে অন্য প্রজন্ম থেকে আলাদা করেছে তাদের ডিজিটাল জীবনধারা।
এই প্রজন্মের বড় অংশ ইন্টারনেটকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে না; শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, বিনোদন, সংবাদ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
ফলে কোনো ইস্যু নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে সেটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আগে যেখানে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগত, এখন একটি হ্যাশট্যাগ, একটি ভিডিও কিংবা একটি অনলাইন প্রচারণাই লাখো তরুণকে একই ইস্যুতে একত্রিত করতে সক্ষম।
জেন জি ভোটারদের কাছে ধর্মীয় বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক—এমন দাবি করা যাবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রজন্মের রাজনৈতিক পছন্দে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তাদের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে—
এই বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচলিত নির্বাচনী ইশতেহারের বাইরে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম তরুণ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সেই সুবিধা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।
শিশু জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমছে, অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা। অর্থাৎ ভারতের তথাকথিত "ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড" ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।
ঠিক এই সময়েই জেন জি দেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে তা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বেকারত্ব, সামাজিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
আগামী নির্বাচনে ভারতের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন।
এখন আর শুধু বড় জনসভা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কিংবা আবেগঘন বক্তব্য দিয়ে তরুণদের দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত রাখা সহজ হবে না।
তারা জানতে চাইবে—
কোথায় নতুন চাকরি?
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার কীভাবে হবে?
পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে কে?
স্টার্টআপের জন্য কী সুযোগ তৈরি হবে?
ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণদের ভবিষ্যৎ কী?
এই প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য উত্তরই আগামী দিনের রাজনৈতিক সাফল্য নির্ধারণ করতে পারে।
ভারতের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশেও তরুণ জনগোষ্ঠী বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরন বদলে দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আগামী দশকে যে প্রবণতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—ডিজিটাল প্রচারণা, তথ্যভিত্তিক জনমত, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং সুশাসনের দাবি—ভারত তার একটি বড় পরীক্ষাগার হয়ে উঠছে।
ভারতের আগামী রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সম্ভবত আর শুধু মতাদর্শের লড়াই হবে না; এটি হবে বিশ্বাসযোগ্যতা বনাম প্রচারণা, কর্মসংস্থান বনাম প্রতিশ্রুতি এবং ডিজিটাল অংশগ্রহণ বনাম প্রচলিত রাজনীতির এক নতুন সংঘাত।
জেন জি এমন এক প্রজন্ম, যারা সরকারকে কেবল নির্বাচনেই মূল্যায়ন করে না; তারা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে, প্রশ্ন তোলে, তথ্য যাচাই করে এবং প্রয়োজনে সংগঠিত হয়।
এই বাস্তবতায় ভারতের গণতন্ত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র ধীরে ধীরে সংসদের বাইরে, কোটি কোটি তরুণ নাগরিকের হাতে ধরা স্মার্টফোনের পর্দায়ও স্থানান্তরিত হচ্ছে।
ভারতের ইতিহাসে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হবে না; এটি হতে পারে একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা।
যে প্রজন্মকে একসময় "আগামী দিনের ভোটার" বলা হতো, তারাই এখন "আজকের নির্ধারক ভোটার" হয়ে উঠছে।
৩৮ কোটির এই জেন জি শুধু নির্বাচন নয়, আগামী দশকের ভারতের অর্থনীতি, নীতি, প্রশাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।
ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে তাই বার্তাটি স্পষ্ট—নতুন ভারতের ভোটার আর শুধু শোনে না, প্রশ্নও করে; শুধু ভোট দেয় না, জনমতও গড়ে; শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অংশীদারও বটে।