
এমএম রহমাতুল্লাহ: সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে অসম্মান করেছে। তাঁর দাবি, প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘সংশোধনের জন্য নয়, জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছে।’ যারা গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সংসদে ও সংসদের বাইরে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। জনগণের দাবি আদায় না করে দলটি সরে যেতে পারে না। শহীদদের রক্তের সঙ্গে কাউকে বেঈমানি করতে দেওয়া হবে না।
শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার হলে শিক্ষাব্যবস্থাও সংস্কার হবে। জ্ঞান ও চরিত্র একই বৃত্তে অঙ্কিত। এই দুইয়ের সমন্বয়ে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার আলোকে একটি শিক্ষানীতি প্রস্তুত করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সরকারের গণহত্যার প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। পরে ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন।
তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে পুরোনো ‘ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি’ ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। তাঁর দাবি, আগে বিভিন্ন ধরনের কোটা থাকলেও এখন শুধু দলীয় কোটায় নিয়োগ ও পদায়ন দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর ‘সবার আগে বিএনপি’ নীতিতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। বিএনপির মনোনীত যেসব প্রার্থী জনগণের ভোটে এমপি নির্বাচিত হননি, তাঁদের কাউকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, কাউকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একইভাবে দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে না এনে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. ইলিয়াস হোসেন মোল্লা এমপি বলেন, যার যার ধর্মের আলোকে নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি পশ্চিমা প্রভাব থেকে বের হয়ে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি ৩১ দফা জাতির সামনে তুলে ধরে যে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার করেছিল, সেখান থেকে তারা সরে যাচ্ছে। ৩১ দফার প্রথম দফা ছিল সংবিধান সংস্কার। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধন করতে চাইছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
মুফতি আলী হাসান ওসামা বলেন, ভাষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি ভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিরা আরও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাব্যবস্থায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবন নষ্ট হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জামাল হোসেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, জেন-জি যে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, তা বাস্তবায়নে বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে। এর মাধ্যমে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সংশোধিত আরপিওতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না—এমন বিধান বাতিলেরও দাবি জানান তিনি। অধ্যাপক মানিক বলেন, অনেক জাতীয় সংসদ সদস্য আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ছিলেন। একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সংসদ সদস্য হতে পারলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না—এ ধরনের বৈষম্য শিক্ষক সমাজ মেনে নেবে না।