
ফিরোজ মাহবুব কামাল
রাজনীতি হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত অথবা সর্বনিকৃষ্ট গুনাহ
রাজনীতি তো তাই যা রাষ্ট্রের নির্মাণ, রাষ্ট্রের সুরক্ষা, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, আইন আদালত ও পরিচালনার সাথে জড়িত। একটি জাতি কতটা সভ্য, ভদ্র ও উন্নত -তার নির্ভুল পরিচয় মেলে সে জাতির রাষ্ট্রের গুণাগুণ দেখে। রাষ্ট্রের গুণাগুণ নির্ভর করে শাসকদের চরিত্র ও আদর্শ, আইনের মান, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দুর্বৃত্তির নির্মূল, সুশাসন এবং জনকল্যাণের আয়োজন দেখে। রাষ্ট্র গণহত্যার ন্যায় নৃশংসতম অপরাধের হাতিয়ার হতে পারে এবং হতে পারে জাহান্নামের বাহন -যেমনটি হয় কম্যুনিস্ট, ফ্যাসিস্ট, পৌত্তলিক, বর্ণবাদীদের শাসিত রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্রের নির্মাণে ও পরিচালনায় যুক্ত হওয়াই হলো সবচেয়ে জঘন্যতম গুনাহ। এ গুনাহ জাহান্নামে নেয়। এমন রাষ্ট্রের রাজনীতি ইসলামে হারাম। তেমনি রাষ্ট্র হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমলের হাতিয়ার। এবং রাষ্ট্র হতে পারে জান্নাতের বাহন -যেমনটি ছিল নবীজী (সা:) ও খোলাফায়ের রাশেদার পরিচালিত রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্রের নির্মাণ ও তার পরিচালনার সাথে জড়িত থাকাই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে যারা জড়িত হয় তারাই জান্নাত পায়। নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের সবাই সে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। অতীতে এমন রাজনীতি মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। এবং মুসলিম উম্মাহকে সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছিল। এমন সৃষ্টিশীল রাজনীতি বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা।
রাষ্ট্রের কাজ শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তা ঘাট, কলকারখানা ও ভৌতিক অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো জান্নাতের যোগ্য মানব নির্মাণ। সে যোগ্য ঈমানদার মানুষগুলি বন জঙ্গলে যেমন গড়ে উঠে না, তেমনি গড়ে উঠে না কাফির, ফাসিক, স্বৈরাচারী, জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট শাসিত রাষ্ট্রে। এসব অনৈসলামিক রাষ্ট্রের কাজ হয় দেশের জনগণকে তাদের অনুগত প্রজা, চাকর বাকর ও জাহান্নামের বাসিন্দা রূপে গড়ে তোলা। সেসব সেক্যুলার রাষ্ট্রের ভাবনা স্রেফ ইহজগতকে ঘিয়ে, সেখানে আখেরাতের ভাবনা কাজ করে না। অথচ জান্নাতের যোগ্য হওয়ার জন্য চাই চেতনা, চরিত্র, কর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীর পরিশুদ্ধি। সে পরিশুদ্ধিকরণের জন্য চাই ইসলামী রাষ্ট্র। কারণ, একমাত্র রাষ্ট্রের হাতে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইন আদালত, পুলিশ, মিডিয়াসহ সমাজ পরিশুদ্ধির শক্তিশালী অবকাঠামো। পরিশুদ্ধিকরণের কাজটি হয় কুর’আন ভিত্তিক জ্ঞান দান, পূর্ণ দ্বীন পালনের সহায়ক পরিবেশ, দূষণমুক্ত সংস্কৃতি, ইসলামী জ্ঞান সমৃদ্ধ বই, জনকল্যাণের রাজনীতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ এজন্যই ফরজ। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ শুধু স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার জন্যই শুধু জরুরি নয়, বরং অতিশয় জরুরি হলো পরকালে জান্নাত পাওয়ার কাজটি সহজ করার জন্যও।
একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই দেয় ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠা এবং পূর্ণ দ্বীন পালনের নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ। অন্য কোন রাষ্ট্র সেটি করে না। বুঝতে হবে, পূর্ণ দ্বীন পালনের অর্থ শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালনের স্বাধীনতা নয়। বরং চাই শিক্ষালয়ে কুর’আন শিক্ষা, আদালতে শরিয়ার বিচার, দুর্বৃত্তির নির্মূলের জিহাদ এবং প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে ইসলামের বিজয়, শরিয়া আইনের বিচার, দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ ও প্যান ইসলামী ভাতৃত্বের ন্যায় ইসলামের এজেন্ডা কিতাবেই থেকে যায়। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এজন্যই এতো জরুরি। মুসলিম জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারেনা। আখেরাতে তো তারাই সফল হয় যাদের জীবন কাটে পূর্ণ দ্বীন পালন নিয়ে এবং মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়ে।
বুঝতে হবে, পূর্ণ দ্বীন পালন ও মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ কখনোই অনৈসলামী রাষ্ট্রে বাস করে সম্ভব নয়। সে জন্য অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্র। তাই যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র নাই সেখানে পূর্ণ ইসলাম পালনও নাই। এবং মহান রব’য়ের এজেন্ডার প্রতিষ্ঠাও নাই। সেগুলি নিছক স্বপ্ন থেকে যায়। মহান রব’য়ের খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ' কাজ তাই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা; এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ মুসলিম জীবনে থাকতে পারে না। সেটি স্পষ্ট বুঝা যায় নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জীবনের দিকে নজর দিলে। নবীজী (সা:) মক্কা ছেড়ে মদিনায় পৌঁছে নিজের জন্য কোন গৃহ নির্মাণে হাত দেননি; বরং প্রথম দিন থেকেই শুরু করেন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ইসলামী রাষ্ট্রের সুরক্ষা দিতে তাঁকে ১০ বছরের শাসনামলে ৮৩টি যুদ্ধ সংঘটিত করতে হয়েছে। সমগ্র মানব ইতিহাসে এটিই হলো সর্বোচ্চ সংখ্যক জিহাদ সংঘটিত হওয়ার রেকর্ড। সে জিহাদের ফসল হলো, সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ -যা বেঁচেছিল ৩৯টি বছর। প্রশ্ন হলো, যারা নিজেদের আশেকে রাসূল (সা:) ও তাঁর উম্মত রূপে পরিচয় দেয়ে তাদের ক’জন বাঁচে নবীজী (সা:)’য়ের সে সূন্নতকে ধারণ করে। ক’জন বাঁচে জিহাদের তাড়না নিয়ে? মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, নবীজী (সা:)’য়ের অক্লান্ত মেহনত এবং অর্ধেকের বেশী সাহাবার শাহাদতের বিনিময়ে অর্জিত মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সে অর্জনকে গোত্রবাদী ও ক্ষমতালোভী আরব দুর্বৃত্তগণ ধ্বংস করে দেয়। প্রতিষ্ঠা দেয় উমাইয়া রাজতন্ত্রের। মহান রব’য়ের এজেন্ডা এবং মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এটিই হলো ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম নাশকতার কাণ্ড। পরিতাপের বিষয় সে নাশকতার কাণ্ডটি কোন পৌত্তলিক, খৃষ্টান বা ইহুদিদের হাতে হয়নি। বরং হয়েছে তাদের হাতে যারা নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করতো। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত এমন নাশকতা কি কখনোই কোন ঈমানদারের কর্ম হতে পারে না। সে নাশকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন নবীজী (সা:)’য়ের নাতী এবং জান্নাতের যুব সর্দার ইমাম হোসেন (রা:)। তাঁকেও গোত্রবাদী দুর্বৃত্তরা নির্মম ভাবে শহীদ করে।
ইসলামী রাষ্ট্র: মানব নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি
এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মানবের হাতে নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণকর সৃষ্টিটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র কাজ করে মানব কল্যাণে প্রণীত মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে; এবং জনগণকে একাত্ম করে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার। সাথে। একমাত্র এমন রাষ্ট্রই কাজ করে জান্নাতের বাহন রূপে। যে দেশে ইসলামী রাষ্ট্র নাই, বুঝতে হবে সেদেশে বিজয়টি শয়তান ও তার অনুসারীদের এবং পরাজয় আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের। তাতে প্রকাশ পায় সেদেশের মুসলিমদের অক্ষমতা এবং মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে তাদের বেঈমানী। মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এ কর্মটি একমাত্র তারাই করতে পারে যারা নিজেদের নিয়োজিত করে জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতে। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো, সে আমৃত্যু সৈনিক হবে এমন এক কল্যাণকর রাষ্ট্রের নির্মাণে ও সুরক্ষায়। সেটিই নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী হওয়ার অর্থ ইসলামের বিজয় ও শরিয়ার বিরোধী হওয়া। সেটি কখনোই কোন মুসলিমের কাজ হতে পারে না; এরাই শত্রু ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর। মুসলিম সমাজে ইসলামের এ শত্রুগণ কখনো বা গুপ্ত, কখনো বা দৃশ্যমান। প্রতি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো, ইসলামের এ শত্রুদের সনাক্ত করা ও তাদের নির্মূলে যুদ্ধ করা। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ সে কাজটিই আমৃত্যু করেছেন। তাদের নির্মূলের কাজটি না হলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ কখনোই সফল হয় না; এমন কি নির্মিত হলেও সে রাষ্ট্র বাঁচে না।
যে রাষ্ট্রগুলি ইসলামী নয়, সে রাষ্ট্রগুলি কাজ করে জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, রাজতন্ত্রী, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট এজেন্ডা নিয়ে -যা ইসলাম বিরোধী এজেন্ডা অর্থাৎ শয়তানের এজেন্ডা। অনৈসলামী রাষ্ট্রগুলো এভাবেই জনগনকে সম্পৃক্ত করে শয়তানের এজেন্ডার সাথে এবং বিজয়ী করে শয়তান ও অনুসারীদের। ফলে সে রাষ্ট্রগুলি পরিণত হয় জাহান্নামের বাহনে। ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাপ কর্ম হলো অনৈসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। এবং অনৈসলামী রাষ্ট্র মাত্রই হলো সে রাষ্ট্রের শাসকদের বেঈমানীর দৃশ্যমান রূপ; বেঈমানী এখানে মহান আল্লাহর ভূ-রাজনৈতিক, বৈচারিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক এজেন্ডার সাথে। এমন রাষ্ট্রের নির্মাণে কখনোই কোন ঈমানদার অংশ নেয় না, কারণ সেটি হারাম। এজন্যই ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মুসলিম কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী ভারত নির্মাণের প্রকল্পে অংশ নেয়নি; তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে। ১৯৭১’য়ে পৌত্তলিক ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক সাহায্য নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, আঞ্চলিকাতাবাদী সেক্যুলারিস্ট ধারার একটি রাষ্ট্র নির্মিত হয় বাংলাদেশে। কোন ইসলামী দল, কোন আলেম, কোন মুফতি ও কোন পীর সেটিকে সমর্থন দেয়নি। কারণ, সেটি ছিল ভারতসেবী বাঙালি সেক্যুলারিস্টদের প্রজেক্ট, সেখানে ইসলাম, নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত এবং ইসলামপন্থীদের কোন স্থান ছিল না। রাষ্ট্র নির্মাণে প্রতিটি মুসলিমের জন্য একমাত্র অনুকরণীয় সূন্নতটি হলো নবীজী (সা:) যেরূপ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, সেরূপ একটি রাষ্ট্রের নির্মাণ। তাই কোন জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার রাষ্ট্র কোন ঈমানদারের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ঈমানদারের লড়াই তো এমন রাষ্ট্রের স্থানে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ।
ঈমানের পরীক্ষা হয় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে
ঈমান নিয়ে বাঁচার অর্থই হলো পদে পদে ঈমানের পরীক্ষা নিয়ে বাঁচা। জান্নাত জুটে একমাত্র সে পরীক্ষায় পাশের পর। ঈমানের সে পরীক্ষাটি হয় মূলত ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে। আর ঈমানদারদের জিহাদ থেকে জন্ম নেয় ইসলামী রাষ্ট্র। নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটি ছিল সম্মিলিত জিহাদের ফসল। যেদেশে জিহাদ নাই, সেদেশে কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হয়না। বরং সে দেশে নির্মিত হয় অনৈসলামী রাষ্ট্র। আর অনৈসলামী রাষ্ট্র মানেই সেটি শয়তান ও তার অনুসারীদের হাতে নানারূপ নাশকতার হাতিয়ার। এবং অনৈসলামী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি হলো, সে রাষ্ট্র অসম্ভব করে পূর্ণ ইসলাম পালন। তখন বাঁচতে হয় অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম রূপে। অপূর্ণাঙ্গ মুসলিমের জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শরিয়া আইন, জিহাদ, কুর’আন শিক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কোন স্থান থাকেনা। এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা ফরজ করেছেন পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়া। এবং যারা পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হয় একমাত্র তারাই জান্নাত হয়। ইবলিস একটি মাত্র হুকুম অমান্য করে অভিশপ্ত শয়তান হয়েছে। অপূর্ণাঙ্গ মুসলিমদের পরিণাম ইবলিসের চেয়ে ভাল হয়না।
ইতিহাসের অতি মূল্যবান শিক্ষা হলো, জিহাদ থেকে যে ইসলামী রাষ্ট্র জন্ম নেয়, সে রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে জনগণের জীবনে অবশ্যই জিহাদকে অবিরাম বাঁচিয়ে রাখতে হয়। কারণ, জনজীবন থেকে জিহাদ বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় ইসলামী রাষ্ট্রও। তখন দখলদারি প্রতিষ্ঠা পায় শয়তান ও তার অনুসারীদের। তখন বিলুপ্ত হয় পূর্ণ ইসলাম পালনের সুযোগ। তখন বাঁচতে হয় আদালতে কুফুরি আইন, অর্থনীতিতে সূদ, নগর বন্দরে পতিতাপল্লী, রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম এবং শিক্ষালয়ে কাফিরদের সাহিত্য ও মতবাদ নিয়ে। তখন ভাসতে হয় জাহিলিয়াত ও দুর্বৃত্তির জোয়ারে। বাংলাদেশ তো তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। নবীজী (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদার আমলে ইসলামী রাষ্ট ছিল বলেই বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগের কোটি কোটি মানুষ জান্নাতের পথ পেয়েছিল এবং নিজেদেরকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিল। এখানেই অসীম গুরুত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের। কিন্তু আজ সে ইসলামী রাষ্ট্র নাই। ফলে কোটি কোটি মানুষ ভেসে যাচ্ছে জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজম ইত্যাদি নানা মতবাদী রাজনীতির স্রোতে জাহান্নামের দিকে।
পবিত্র কুর’আনে যে বিষয়টি মহান আল্লাহ তায়ালা বার বার উল্লেখ করেছেন তা হলো, পরীক্ষায় পাশ না করে জান্নাত পাওয়ার কোন পথ নাই। সে পরীক্ষা নবী রাসূলদেরও দিতে হয়েছে। জান্নাত দেয়ার আগে পরীক্ষা নেয়াই মহান আল্লাহ তায়ালার সূন্নত। মু’মিনকে সে পরীক্ষাটি দিতে হয় “সত্য ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যা ও অবিচারের নির্মূলের জিহাদের নিজের শ্রম, সময়, মেধা, অর্থ ও প্রাণের বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে। এমন কি এ পথে শহীদ হওয়ারও পূর্ণ প্রস্তুতি থাতে হয়। ঈমানের দাবীতে কে কতটা সাচ্চা এবং কে ভণ্ড –সেটি প্রকাশ করে দেয়ার জন্যই এ পরীক্ষার আয়োজন। ফলে মুনাফিকি গোপন রাখার কোন পথ নাই। মহান রব’য়ের সে পরিকল্পনার ঘোষণাটি এসেছে নিচের আয়াতে:
وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ
অর্থ: “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন এবং প্রকাশ করে দিবেন যারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই জেনে নেবেন যারা মুনাফিক।”-(সুরা আনকাবুত, আয়াত ১১)।
ঈমানের পরীক্ষা নেয়া হয় জালেম শক্তির মুখোমুখি হাজির করে। ঈমানের সে কঠিন পরীক্ষাটি কুর’আন পাঠ, নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালনের মধ্য দিয়ে হয় না। সেরূপ ইবাদত বহু জালেম, ফাসেক, মুনাফিক, ঘুষখোর, সূদখোর, মিথ্যাবাদী দুর্বৃত্তগণও করতে পারে। যা সবাই করতে পারে -তা দিয়ে কখনো কে ঈমানদার এবং কে বেঈমান -সে বাছাইয়ের কাজটি হয়না। যে নামাজ ও রোজা বেঈমান ও মুনাফিক উভয়ই পালন করতে পারে -তা দিয়ে ঈমানের পরীক্ষাটি হয় না। ফলে হয়না ঈমানদারের বাছাইয়ের কাজটি। বাছাইয়ের সে কাজটি করে জিহাদ। কারণ, বেঈমানগণ কখনো জিহাদের ধারে কাছে যায় না; তারা বরং জিহাদের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করে। জিহাদ তাই ঈমানদার বাছাইয়ের শ্রেষ্ঠ পরীক্ষা।
এ পার্থিব জীবনের পুরা মেয়াদ ও পুরা কর্মক্ষেত্রই হলো মু’মিনের জন্য পরীক্ষা পর্ব। বস্তুত পরীক্ষা নেয়ার জন্যই মানবের সৃষ্টি এবং পৃথিবী পৃষ্ঠে মানবের আগমন। এবং মৃত্যুহীন আখেরাত হলো প্রতিদানের জায়গা। যারা পরীক্ষায় পাশ করে তাদের জন্য জান্নাত এবং যারা ফেল করে তাদের জন্য হলো জাহান্নাম। সেটির উল্লেখ এসেছে নিচের আয়াতে:
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
অর্থ: “যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন -কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” –(সুরা মুলক, আয়াত ২)।
নিশ্চিত পরীক্ষার বিষয়টি চেতনায় ধারণ করে যারা প্রতি দিন ও প্রতি ঘন্টা প্রস্তুতি নেয়, একমাত্র তারাই পরীক্ষায় পাশ করে। অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এমন, তারা পরীক্ষার বিষয়টি বিশ্বাস করে বটে, কিন্তু নানা ব্যস্ততা, অর্থ সম্পদ, সামজিক খ্যাতি ও আনন্দ ফুর্তিতে ডুবে থাকার কারণে পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় থাকে না। এরাই পরীক্ষা ফেল করে এবং জাহান্নামে যায়। পরীক্ষায় পাশের পরই আসে প্রমোশন। সফল মু’মিনের জীবনে সে বিশাল প্রমোশনটি আসে জান্নাতপ্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে। তখন শুরু হয় আনন্দ-উপভোগময় এক মৃত্যুহীন জীবন।
দুনিয়ার এ জীবনে কোন কিছুই বিনা মূল্যে জুটে না, সব কিছুর মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। প্রাপ্তিটি যত বড়, মূল্যও তত বিশাল। ঈমানদারদেরও তাই জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে হয় মৃত্যুর আগেই। এমন কি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদেরও। তবে সে মূল্যটি পরিশোধের নিয়মটি ভিন্ন; জান্নাত সম্পদ দিয়ে কেনা যায় না। কিনতে হয় জীবন-ভর আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি হুকুম পালনের মধ্য দিয়ে। কিনতে হয় তাঁর এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার জিহাদ নিয়ে । সে জিহাদে থাকতে হয় অর্থ, শ্রম, মেধা, সময় ও রক্তের বিনিয়োগ। মহান আল্লাহ তায়ালার যে কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা সে পরীক্ষায় পাশের সম্ভাবনাকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়। পরীক্ষা কি ভাবে নেয়া হবে -সে বিবরণ পবিত্র কুর’আনের বহু সুরাতে বহু ভাবে বর্ণিত হয়েছে। সে পরীক্ষা নিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার নিজের বর্ণনাটি শোনা যাক:
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا۟ ٱلْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ ٱلَّذِينَ خَلَوْا۟ مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ ٱلْبَأْسَآءُ وَٱلضَّرَّآءُ وَزُلْزِلُوا۟ حَتَّىٰ يَقُولَ ٱلرَّسُولُ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ مَعَهُۥ مَتَىٰ نَصْرُ ٱللَّهِ ۗ أَلَآ إِنَّ نَصْرَ ٱللَّهِ قَرِيبٌۭ
অর্থ: “তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে, তোমরা এমনিতেই (বিনা পরীক্ষায়) জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনো তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও প্রকম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল এবং তাঁর সাথের সঙ্গিরা যারা ঈমান এনেছিল বলে উঠেছিল, ”আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?” জেনে রাখ, আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই নিকটে।”–(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪)।
লাব্বায়েক বলতে হয় জিহাদের আযানে
মক্কার কাফের সমাজেও নামাজ পড়া অসম্ভব ছিল না। কিন্তু অতি কঠিন ছিল শরিয়া পালন এবং ইসলামের সামাজিক সুবিচারের নীতি নিয়ে বাঁচা। সে সমাজে অসম্ভব ছিল দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুনীতি-সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। তখন আবু জেহেল ও আবু লাহাবদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-শোষন, চুরি-ডাকাতি, শিশুহত্যা, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের ন্যায় দুর্বৃত্তির জোয়ার। যেখানেই প্রতিষ্ঠা পায় মিথ্যাচার, দুর্বৃত্তি ও জুলুম-র্নির্যাতন এবং বিলুপ্ত হয় আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন, সেখানেই প্রতি মুহুর্ত ধ্বনিত হয় জিহাদের আযান। নামাজের আযান দেয় মুয়াজ্জিন; আর জিহাদের আযান দেন খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা। পবিত্র কুর’আনে বার বার ধ্বনিত হয়েছে জিহাদের সে আযান। মুসলিমকে শুধু নামাজের আযানে লাব্বায়েক বললে চলে না, লাব্বায়েক বলতে হয় জিহাদের আযানেও। কিন্তু যারা কুর’আন যারা পড়লো না, পড়ার পরও যারা বুঝলো না -তারা জিহাদের সে আযান শুনবে কিরূপে? সে আযানে লাব্বায়েকই বা বলবে কিরূপে? বরং তারা লাব্বায়েক বলে শয়তানের আযানে।
প্রতিটি মুসলিম ভূমিতে শয়তানের খলিফারা আযান দেয় ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ার রাজনীতির নামে। আযান দেয় সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, রাজতন্ত্র, কম্যুনিজম, লেবারালিজম ইত্যাদি নানা মতবাদী রাজনীতির নামে। বাংলাদেশের মত অধিকাংশ মুসলিম দেশের অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তায়ালার আযানে লাব্বায়েক বলে না; বরং লাব্বায়েক বলে শয়তানের আযানে। সেটি বুঝা যায় তাদের হাতে শয়তানের এজেন্ডার বিশাল বিজয় দেখে। মুসলিম দেশে শয়তানের বিজয় দৃশ্যমান হয় জাতীয়তাবাদী বা ফ্যাসিবাদী সেক্যুলার রাষ্ট্র, সূদী কারবার, দুর্বৃত্তির প্লাবন এবং পতিতাপল্লীতে জ্বিনার ব্যবসার বৈধতা দেখে। অনৈসলামী রাষ্ট্রের পাপের সাথে শুধু বেঈমান শাসক শ্রেণী জড়িত থাকে না, বরং জড়িত করা হয় জনগণকেও। জনগণ যদি আল্লাহ তায়ালার ডাকে লাব্বায়েক বলতো এবং নবীজী (সা:)’য়ের অনুসারী হতো তবে তো তারা নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের অনুকরণে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিহষ্ঠা দিত। কারণ, অনৈইসলামী রাষ্ট্রে অসম্ভব হলো পূর্ণ ইসলাম পালন। পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য প্রতিষ্ঠা দিতে হয় ইসলামী রাষ্ট্রের -যেমন প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন নবীজী (সা:)। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছাড়াই যদি পূর্ণ ইসলাম পালন সম্ভব হতো তবে নবীজী কেন সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষার জন্য ৮৩টি যুদ্ধ সংঘটিত করলেন? কেন অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদ হলেন?
নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত নিয়ে বাঁচে না দেওবন্দী আলেমগণ
পরিতাপের বিষয় হলো, দক্ষিণ এশিয়ার বহু আলেম -বিশেষ করে দেওবন্দী আলেমগণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে ভাবে না। নবীজী (সার)’য়ের ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সূন্নত নিয়ে তারা বাঁচে না। তাদের এজেন্ডা বেশী বেশী মসজিদ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা, তাবলিগী প্রচার ও সুফি ত্বরিকার কার্যক্রম নিয়ে। এসব দেওবন্দী আলেমদের অনেকেই মনে করেন, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না দিয়েও পূর্ণ ইসলাম পালন সম্ভব। তাই দেওবন্দী আলেমদের সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ১৯৪৭ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসিত অখণ্ড ভারত প্রকল্পের পক্ষ নিয়েছিল এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রবল বিরোধীতা করেছিল। তখন দেওবন্দী আলেমগণ সেক্যুলার কংগ্রেসের সাথে ভারতী জাতীয়তাবাদের পতাকাবাহী হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে আসামের সিলেট জেলায় যখন পাকিস্তানে যোগদানের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তখন দেওবন্দী আলেমগণ এবং তাদের নেতা হুসেন আহমেদ মাদানী সিলেট জেলাকে ভারতে রাখার পক্ষে তীব্র প্রচারণা চালায়। এমন কি পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা পেল, তখনও তারা সে রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা ও শক্তিশালী করার কোন চেষ্টায়ই করেনি। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের তৎকালীন প্রধান মাওলানা আসাদ মাদানী বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার চালাতে আসতেন। কারণ, ভারত সরকারের প্রিয় সংগঠন হলো আওয়ামী লীগ; ফলে দিল্লির শাসকচক্র দলটির বিজয় চাইতো।
দেওবন্দীদের একটি গ্রুপ খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে কওমী জননীও বলেছে এবং তার থেকে আর্থিক ফায়দা নিয়েছে। তাদের অনেকে জামায়াতে ইসলামী ভোট দেয়া হারাম বলে, কিন্তু বিএনপি’য়ের ন্যায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বিরোধী দলকে ভোট দেয়া হারাম বলে না। এরা অতীতে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়া হারাম বলেনি। আফগানিস্তানের দেওবন্দীদের হাতে এখন আফগান জাতীয়তাবাদের পতাকা। তারা ভারতের সাথে বন্ধুত্ব গড়েছে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। দেওবন্দী আলেমদের কাছে ইসলাম পালন হলো নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও তাসবিহ তাহলিল। তাদের কাছে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং মুফতি হওয়াকেই জীবনের বিশাল অর্জন মনে হয়। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র না থাকাতে তাদের বাঁচতে হচ্ছে পূর্ণ ইসলাম পালন না করেই। কারণ, মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, শরিয়া আইনের বিচার, দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ তো মসজিদের জায়নামাজে ও মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে পালন করা যায়না। সেজন্য অবশ্যই রাষ্ট্র ও তার বিশাল অবকাঠামো লাগে।
এমন কি নবীজী (সা:)’য়ের আমলেও এমন কিছু লোক ছিল -যারা নামাজের আযানে লাব্বায়েক বলতো বটে, কিন্তু লাব্বায়েক বলতো না জিহাদের আযানে। ওহুদের যুদ্ধের সময় এরা ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই এবং তার তিন শত সহচর। তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। অথচ তারা নবীজী (সা:)’য়ের পিছনের নামাজ পড়েছে। মাহে রমযানের রোজাও রেখেছে। যাকাতও দিয়েছে। অথচ সে নামাজ, রোজা ও যাকাত তাদের মুসলিম বানাতে পারিনি। খোদ নবীজী (সা:)’য়ের আমলেই তারা মুনাফিকের খেতাব পেয়েছে। তাই ঈমানদারদের উপর ফরজ শুধু হিংস্র পশু ও বিষাক্ত প্রাণীগুলিকে চেনা নয়, বরং এ ঘাতক মুনাফিকদের চেনাও। কারণ মুসলিম উম্মাহর বড় বড় ক্ষতিগুলি হিংস্র পশু ও বিষাক্ত প্রাণীগুলি থেকে হয়না, বরং সেগুলি হয় এসব মুনাফিকদের হাতে। তারাই মুসলিমদের ঘরের শত্রু।
মহান আল্লাহ তায়ালার বিচারে কাফিরদের চেয়েও অধিক অপরাধী হলো মুনাফিকগণ। তাদের জন্য শাস্তির মাত্রাও অধিক। মুনাফিকদের নিয়ে মহান রব’য়ের ঘোষণা:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
অর্থ: “নিঃসন্দেহে মুনাফিকদের জন্য হলো দোযখের সর্বনিম্ন স্তর। আর তাদের জন্য আপনি কোন সাহায্যকারী দেখতে পাবেন না।”–(সুরা নিসা, আয়াত ১৪৫)।
জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের স্তর বলতে বুঝায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আযাবপূর্ণ স্থান। মুনফিকদের জন্য এরূপ আযাবের কারণ, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে মুনাফিকদের শত্রুতা ও নাশকতা কাফিরদের চেয়েও অধিক গুরুতর। বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে যারা আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইনকে বিলুপ্ত করে রেখেছে। মুসলিম উম্মাহকে যারা ৫০টির বেশি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে রেখেছে -তারা কোন পৌত্তলিক কাফির শক্তি নয়, বরং তারা হলো মুসলিম নামধারী মুনাফিক। এরা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজ্জ করে, যাকাতও দেয়। দাড়ি-টুপিও আছে। এরা ওয়াজের মাহফিলও করে। এরা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথাও বলে। কিন্তু ইসলামের যে ভূ-রাজনৈতিক, বৈচারিক, আর্থ-সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, শিক্ষা-সাংস্কতিক ভিশন, মিশন ও এজেন্ডা রয়েছে -এরা সেগুলির শত্রু। সেগুলি পণ্ড করতে এমন কি বিদেশী কাফির শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়ে।
মুসলিমের মুখোশধারী মুনাফিকগণ চায় না, মুসলিম উম্মাহ আবার প্রতিষ্ঠা পাক বিশ্বশক্তি রূপে। এবং তারা চায় না, কোথাও প্রতিষ্ঠা পাক মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন। বরং তাদের উৎসব হলো ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি নিয়ে। একারণেই মুসলিম উম্মাহর ভূগোল ভাঙার দিনগুলি তাদের কাছে অতি গর্বের। মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তি প্রতিষ্ঠা দেয়ায় এবং সে বিভক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে তারা এমন কি কাফির শক্তির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে যুদ্ধ করতে রাজী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে এ মুনাফিকদের দেখা গেছে ইংরেজ ও ফরাসী কাফিরদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে উসমানিয়া খেলাফত ভেঙে ২২টি আরব রাষ্ট্রের নির্মাণে। মুসলিম উম্মাহর হৃৎপিন্ডের উপর ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা বস্তুত সে বিভক্তিরই ফসল। ১৯৭১’য়ে ইসলামের এ শত্রুদের দেখা গেছে হিন্দুত্ববাদী ভারতের সাথে জোট বেঁধে তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে খণ্ডিত করতে। বিজয় এখানে বিদ্রোহের তথা পাপের রাজনীতির।
ইসলাম বিরোধী শক্তির মাঝে আনন্দমুখর উৎসব দেখা যায় মুসলিম উম্মাহর ১৯৭১’য়ের শক্তিহানীতে। তা নিয়ে বছরের ৩৬৫ দিনের প্রতি দিন ও প্রতি ঘন্টা উৎসব হয় ঢাকা সেনানীবাসের শিখা অনির্বান নামক স্থানে গ্যাসের প্রদীপ জ্বালিয়ে। উৎসবের এটি এক অভিনব হারাম পথ। এখানে মহান রব’য়ের দেয়া নিয়ামতের খেয়ানত হয় মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম কাজকে মহিমান্বিত করতে। নবীজী (সা:) মুনাফিকদের ৪টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। সেগুলির একটি হলো, তারা আমানতের খেয়ানত করে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান নিজেই ছিল বাঙালি মুসলিমদের উপর অর্পিত এক বিশাল আমানত। তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক কখনো নিজ দেশ ভাঙে না, বরং সে অর্পিত আমানতের সুরক্ষা দেয়। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক ভূমিকা ছিল বাঙালি মুসলিমদের। কিন্তু বাঙালি মুসলিমগণ সে আমানতের খেয়ানত করেছে। বাঙালি মুসলিমের ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ। বাংলাদেশে সে আমানতের খেয়ানতের উপর মহোৎসব হয় আরেক মূল্যবান আমানত দেশের গ্যাস সম্পদ জ্বালিয়ে। বাংলাদেশে বিবেকের আকাল এতো বেশী যে, এ খেয়ানত নিয়ে দেশে কোন প্রতিবাদ নাই। ০১/০৮/২০২৬