
নিজস্ব প্রতিবেদক: হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে সাংবাদিক ও বাংলাদেশ পরিবেশ পরিক্রমা মানবাধিকার সাংবাদিক সোসাইটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এবং সিলেট বিভাগীয় সভাপতি আশাহীদ আলী আশার ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার ন্যায়বিচার না পাওয়া, মামলার তদন্তে গুরুতর অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তাকে ও তার পরিবারকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর অভিযোগ তুলে পুলিশ সুপারের কাছে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
সম্প্রতি সংগঠনটির ভাইস-চেয়ারম্যান এম এম তোহা স্বাক্ষরিত একটি লিখিত আবেদনে পুলিশ সুপার, হবিগঞ্জের কাছে এ দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং সিলেট রেঞ্জের ডিআইজিকেও আবেদনটির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, আশাহীদ আলী আশা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করে আসছেন। কিন্তু গত ৩ জুলাই ২০২৫ নবীগঞ্জ শহরের গাজীরটেক এলাকার লতিফ সুপার মার্কেটের সামনে অবস্থানকালে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হামলার সময় আত্মরক্ষার্থে তিনি একটি সেলুনে আশ্রয় নিলেও হামলাকারীরা সেখানে প্রবেশ করে তাকে আক্রমণের চেষ্টা করে। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান।
আবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পর নবীগঞ্জ থানা পুলিশ হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুইজনকে আটক করলেও পরদিন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় সামাজিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আটক ব্যক্তিদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ করা হয়েছে, পরবর্তীতে ঘটনাপ্রবাহ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে প্রকৃত হামলাকারীদের আড়াল করা হয় এবং আশাহীদ আলী আশাকেই বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে ৭ জুলাই ২০২৫ তিমিরপুর ও আনমনু এলাকায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে বলে আবেদনপত্রে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনে নবীগঞ্জ থানার মামলা নং-১০/১৫৭-এর তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুল কাদিরের বিরুদ্ধে তদন্তে নিরপেক্ষতা বজায় না রাখা, দায়িত্বে অবহেলা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রকৃত ভুক্তভোগীকে উল্টো আসামি হিসেবে উপস্থাপন করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এছাড়া আবেদনপত্রে দাবি করা হয়, নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন ব্যয় ও আর্থিক হিসাব-নিকাশ বিষয়ে জবাবদিহিতা দাবি করাকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে হামলা এবং পরবর্তীতে আইনি হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
একই আবেদনে খরছু তালুকদার নামে এক ব্যক্তির এক লাখ টাকা লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগও ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। আবেদনকারীর ভাষ্য, আশাহীদ আলী আশার সঙ্গে ওই ব্যক্তির কোনো আর্থিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। মোবাইল কল রেকর্ড (সিডিআর), কল ট্র্যাকিং, মোবাইল লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য যাচাই করলে অভিযোগের অসত্যতা প্রমাণিত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, আশাহীদ আলী আশার ছেলে তানজিদ হোসেন জয়, যিনি হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী, তাকেও কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছাড়া মামলার আসামি করা হয়েছে। এতে তার শিক্ষা জীবন ও ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, পরবর্তীকালে সংঘটিত লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা অন্যান্য মামলায় আশাহীদ আলী আশা বা তার পরিবারের সদস্যদের নাম নেই। ক্ষতিগ্রস্তদের দায়ের করা মামলাতেও তাদের আসামি করা হয়নি। এ কারণে নির্দিষ্ট একটি মামলায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করাকে প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবেদনে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে পুনঃতদন্ত, তদন্তকারী কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত, হামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগ থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল কল রেকর্ড, ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য যাচাই করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন।
আবেদনকারী এম এম তোহা বলেন, একজন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আশাহীদ আলী আশা দীর্ঘদিন ধরে অসহায় মানুষের পাশে কাজ করে আসছেন। অথচ বর্তমানে তিনিই এবং তার পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত বলে তারা মনে করছেন। তাই সুষ্ঠু বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আবেদনপত্রে উত্থাপিত সব অভিযোগ আবেদনকারীর বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।