
নিজস্ব প্রতিবেদক: গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্য কমানো, বৈষম্য দূরীকরণ, খুন-গুমের বিচার এবং সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। রাজধানীর মুক্তাঙ্গণে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচি থেকে ধারাবাহিক লংমার্চ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়ে নেতারা বলেছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মুক্তাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়; এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের ন্যায্য দাবির আন্দোলন।
তিনি বলেন, জনগণের সামনে ১১ দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে আনা, বৈষম্য দূর করা, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং অতীতের খুন, গুম, নির্যাতন ও সম্পদ লুণ্ঠনের বিচার নিশ্চিত করা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা বিরোধী মত দমনে গুলি, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। আন্দোলনে বাধা দেওয়া হলে তা আরও বেগবান হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
পাঁচ দফা নতুন কর্মসূচি
সমাবেশ থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচিগুলো হলো—
৫ সেপ্টেম্বর: ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ
১৯ সেপ্টেম্বর: ঢাকা-রংপুর লংমার্চ
১০ অক্টোবর: ঢাকা-খুলনা লংমার্চ
২৪ অক্টোবর: ঢাকা-সিলেট রেল লংমার্চ
১৪ নভেম্বর: ঢাকায় মহাসমাবেশ
কর্মসূচি ঘোষণা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সচিবালয়ে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের দাবি শুনতে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। সচিবালয় কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা
সমাবেশে বক্তারা দেশের জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহ, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে সরকারের সমালোচনা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চুলায় গ্যাস, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি এবং যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস নিশ্চিত করতে হবে। এলপিজির বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং গ্যাসের নতুন মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়ারও ইঙ্গিত দেন।
সরকারের বিরুদ্ধে 'ব্যর্থতার' অভিযোগ
এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি অভিযোগ করেন, পাঁচ মাসে সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। ক্যাম্পাসে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি।
অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম দেশের ব্যাংকিং খাত, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, দক্ষ ও সৎ নেতৃত্ব ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতি পরিচালনায় নীতিগত দুর্বলতারও সমালোচনা করেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ দেশের গ্যাসসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য এলএনজি আমদানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন বলেন, জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হলে জনগণের কাছে তার জবাবদিহি করতে হবে।
ক্যাম্পাস রাজনীতি ও জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতা
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বন্ধ করে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জুলাই-সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রত্যাশা পূরণের আহ্বান জানান তিনি।
জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে দেশের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে বৃহত্তর গণআন্দোলনের প্রস্তুতির আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চানও সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে রাজনৈতিক সংস্কার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দাবি জানান।
ভুক্তভোগী পরিবার ও বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণ
সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন। তারা জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, শিল্পখাতের স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়কারীরাসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সামনে কী?
পর্যবেক্ষকদের মতে, ধারাবাহিক লংমার্চ ও নভেম্বরের মহাসমাবেশের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এসব কর্মসূচি কতটা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে, সরকারের প্রতিক্রিয়া কী হবে এবং ঘোষিত দাবিগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক সংলাপের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—এসব প্রশ্নই আগামী সপ্তাহগুলোতে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।