
ফিরোজ মাহবুব কামাল
এ পৃথিবী পৃষ্ঠের যুদ্ধ মাত্র দুই প্রকারের: এক). আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার যুদ্ধ; দুই). শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার যুদ্ধ। তৃতীয় কোন প্রকারের যুদ্ধ নাই। আল্লাহ তায়ালার যুদ্ধের এজেন্ডা হলো তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ার প্রতিষ্ঠা এবং সকল ধর্ম ও সকল মতবাদের উপর ইসলামের বিজয়। মহান রব’য়ের আরো এজেন্ডা হলো, মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ভৌগলিক অখণ্ডতাকে সুরক্ষা দেয়া। অপর দিকে শয়তানের যুদ্ধটি হয় আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে পরাজিত করতে এবং গোত্রবাদী, জাতীয়তাবাদী, দলবাদী, রাজতন্ত্রী, সাম্রাজ্যবাদী, বর্ণবাদী বা অন্যকোন মতবাদী এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে। এ বিশ্বটি বস্তুত যুদ্ধময়; এ যুদ্ধে কে কোন পক্ষ নিল -তার ভিত্তিতে মানবজাতির বিভাজনটিও দ্বিভাগে। তৃতীয় কোন ভাগ নাই। এক). আল্লাহর আনসার তথা আল্লাহর সাহায্যকারী পক্ষ; দুই). শয়তানের আনসার তথা শয়তানের সাহায্যকারী পক্ষ। যারা আল্লাহর আনসার, তাদের কাজ মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। সে কখনো ভারতের ন্যায় পৌত্তলিক কাফির শক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়না -যেমন মুক্তিবাহিনী যোগ দিয়েছিল ১৯৭১’য়ে। শরিয়ার বিচারে ১৯৭১’য়ের যুদ্ধটি ছিল হারাম যুদ্ধ। কারণ এ যুদ্ধের লক্ষ্য ইসলামকে বিজয়ী করা ছিল না। বরং যে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে ভারতের ন্যায় একটি পৌত্তলিক কাফির রাষ্ট্র এবং খণ্ডিত হয় পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সে যুদ্ধ হালাল হয় কি করে। যারা শয়তানের আনসার, তাদের কাজ শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। বাংলাদেশে এরাই বিজয়ী পক্ষ।
মুসলিমের প্রতিটি পানাহার যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধও হালাল হতে হয়। এবং প্রতিটি হালাল যুদ্ধই হলো পবিত্র জিহাদ। জিহাদে যোগ দেয়ার অর্থ জান্নাতের পথে যাত্রী হওয়া। এ যুদ্ধে কেউ নিহত হলে সে বিনা হিসাবে জান্নাতে পায়। ঈমানদারের দায় হলো, জিহাদ ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধে যোগ দেয়া থেকে নিজেকে বাঁচানো। বুঝতে হবে, জিহাদের মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার -এখানে কোন ব্যক্তি, দল, জাতি বা গোত্রের দখলদারি থাকে না। এ জন্যই পবিত্র কুর’আনে জিহাদকে বলা হয়েছে “জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।” অর্থ: আল্লাহর পথে জিহাদ। এ জন্যই ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াইটি খোদ মহান আল্লাহ তায়ালার লড়াই। নিজের দ্বীনকে বিজয়ী করার সে লড়াইয়ে তিনি ফেরেশতাদের নামিয়ে সাহায্য করবেন– তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? অতীতে সেরূপ সাহায্য তিনি বার বার করেছেন।
পানাহার ও যুদ্ধের ন্যায় হালাল হতে হয় মুসলিমের রাজনীতিও। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে হারাম পানাহার, মানব হত্যা, চুরি ডাকাতি ও ধর্ষণের কারণে নয়, বরং হারাম রাজনীতি ও হারাম যুদ্ধে অংশ নেয়ার কারণে। ঈমানের পরীক্ষা হয় এ দুটি ক্ষেত্রে। বস্তুত রাজনীতি নিজেই একটি আমৃত্যু যুদ্ধ। এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণে নিরস্ত্র যুদ্ধ হয় একটি এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে। ঈমানদার মুসলিমদের কাছে সে এজেন্ডাটি হলো মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। অপরদিকে যারা বেঈমান তথা কাফির তাদের রাজনীতির এজেন্ডা হয় মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে পরাজিত রাখা; এবং জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ, দলবাদ, ফ্যাসিবাদ, কম্যুনিজম, রাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজমের ন্যায় হারাম এজেন্ডাকে বিজয়ী করা।
বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে মুসলিমদের আসক্তি যেমন হারাম যুদ্ধে তেমনি হারাম রাজনীতিতে। মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ার বিলুপ্তি নিয়ে তাদের রাজনীতি। তারা যেমন হারাম রাজনীতির বিজয় নিয়ে উৎসব করে, তেমনি উৎসব করে হারাম যুদ্ধের বিজয় নিয়েও। এভাবেই দৃশ্যমান করে তাদের বেঈমানী। বাঙালি মুসলিমের সে বেঈমানী প্রতিবছর সেটি দৃশ্যমান হয় ১৬ ডিসেম্বর এলে। সে উৎসবে এমন কি তাদের দেখা যায় যারা নিজেদের ইসলামী শিবিরের বলে পরিচয় দেয়। এদের গাদ্দারীর কারণেই বাংলাদেশের মত তথাকথিত মুসলিম দেশে বিশাল পরাজয়টি ইসলামের তথা মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার।
অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু নামাজী, রোজাদার ও হাজী হওয়া নয়; বরং মহান আল্লাহ তায়ালার আনসার হওয়া। রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ এ পৃথিবীতে ঈমানদারের জন্য নীরব দর্শক হওয়ার কোন সুযোগ নাই। নিষ্ক্রিয় দর্শক হওয়াটাই বেঈমানী। নবীজী (সা:)য়ের কোন সাহাবী নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। জিহাদ থেকে দূরে থাকা নিষ্ক্রিয়দের মুনাফিক বলা হয়েছে। ঈমানদার হওয়ার অর্থই জিহাদ নিয়ে বাঁচা। আনসার হওয়ার সুস্পষ্ট হুকুম এসেছে সুরা সাফ’য়ের ১৪ নম্বর আয়াতে:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُونُوٓا۟ أَنصَارَ ٱللَّهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ٱبْنُ مَرْيَمَ لِلْحَوَارِيِّـۧنَ مَنْ أَنصَارِىٓ إِلَى ٱللَّهِ ۖ قَالَ ٱلْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ ٱللَّهِ ۖ فَـَٔامَنَت طَّآئِفَةٌۭ مِّنۢ بَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ وَكَفَرَت طَّآئِفَةٌۭ ۖ فَأَيَّدْنَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ عَلَىٰ عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا۟ ظَـٰهِرِينَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও। যেমন মরিয়ম-পুত্র ঈসা তাঁর অনুসারীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে কে আমার সাহায্যকারী হবে? তাঁর অনুসারীগণ জবাবে বলেছিলেন, “আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী।” অতঃপর বনি ইসরাইলীদের মধ্য থেকে একদল ঈমান আনলো, এবং এক দল অবাধ্য হলো। যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমি শক্তিশালী করলাম শত্রুদের মোকাবেলায় এবং তারা বিজয়ী হলো।”–(সুরা সাফ, আয়াত ১৪)।
মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য হলো: সে বাঁচবে একমাত্র মহান আল্লাহর খলিফা রূপে। এবং যারা আল্লাহর খলিফা, তারাই তাঁর আনসার। যারা ব্যর্থ হয় আল্লাহ তায়ালার আনসার হতে; বুঝতে হবে তাদের বিদ্রোহ ও গাদ্দারীটি মহান আল্লাহর এজেন্ডার বিরুদ্ধে। জিহাদে বিজয় দানের বিষয়টি একান্তই মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌম বিষয়। ঈমানদারগণ সে লড়াইয়ে আল্লাহর সাহায্যকারী মাত্র। আর এরূপ সাহায্যকারী হওয়ার মধ্য দিয়েই চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় বান্দাহর ঈমানদারীর। নইলে সে বিজয়ের কাজটি মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের “কুন, ফা ইয়াকুন”য়ের নির্দেশের মাধ্যমেই করতে পারতেন।
গৌরব যুগের মুসলিমদের থেকে আজকের মুসলিমদের মূল পার্থক্য হলো: সে যুগের মুসলিমগণ শুধু নামাজী, রোজাদার ও হাজী হওয়াকে গুরুত্ব দিতেন না, তারা জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কাটিয়েছেন মহান আল্লাহ তায়ালার সাহায্যকারী সৈনিক তথা আনসার রূপে। সে দায়িত্ব পালনের কাজে নবীজী(সা:)’য়ের অর্ধেকের বেশি সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ মহান আল্লাহ তায়ালার আনসার হতে রাজী নয়, তারা মোনাজাত করেই বিজয় আনতে চায়। অথচ তারা আনসার হয় অনৈসলামী শক্তির। বাংলাদেশের মত দেশে তারা আনসার রূপে কাজ করে সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট, জাতিয়তাবাদী, উপজাতীয়তাবাদী, গোত্রবাদী শাসক শক্তির। অনেকে সাহায্যকারী রূপে কাজ করে বিদেশী অমুসলিম শক্তির সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় মুসলিম এবং ১০ লাখ আরব মুসলিম আনসার তথা সাহায্যকারী রূপে যোগ দিয়েছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। অনেকে যোগ দিয়েছিল ফরাসী সেনাবাহিনীতেও। ব্রিটিশ কাফিরদের আনসার রূপে সেনাবাহিনীতে কাজ করেছে এমন কি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর মত ব্যক্তিবর্গ। ইসলামের আনসার হওয়ার বদলে বাঙালি মুসলিম যে কত সহজে কাফির শক্তির আনসার হয় – এ হলো তার নমুনা। ১৯৭১’য়ের ন্যায় আজও কি বাংলাদেশের মাটিতে পৌত্তলিক ভারতের আনসারের সংখ্যা কম? ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধটি তো তারাই করছে।