
ডারউইন থেকে বিশেষ প্রতিবেদন: ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লিখল বাংলাদেশ ক্রিকেট। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়—তাও আবার বিশ্ব টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে নয় উইকেটে হারিয়ে! ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে চার দিন ধরে একতরফা দাপট দেখিয়ে রোববার অসাধারণ এই কীর্তি গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
শুধু জয় নয়, জয়ের ধরনই এই সাফল্যকে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটিতে পরিণত করেছে। টস জেতার পর প্রথম সেশন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ১১টি সেশনেই অস্ট্রেলিয়ার ওপর আধিপত্য ধরে রাখে তারা—যা টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য এক নজিরবিহীন পারফরম্যান্স।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক শান্তর কণ্ঠেও ছিল সেই গর্ব। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে তিনি বলেন, ‘এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেটের যেকোনো ফরম্যাটে সবচেয়ে বড় জয়।’ একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করার প্রত্যয়ও জানান তিনি।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের ভিত্তি গড়ে দেন পেসার হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দিতে তিনি নেন ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেট, খরচ করেন ৫৫ রান।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি পেসারও হয়ে যান হাসান। প্রথম ইনিংসেই স্বাগতিকদের ব্যাটিং লাইনআপে এমন ধস নামায় বাংলাদেশ, যার ধাক্কা সামলাতে পুরো ম্যাচজুড়েই হিমশিম খেতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে।
বল হাতে দারুণ শুরুর পর ব্যাট হাতেও বাংলাদেশ দেখায় দৃঢ়তা। ওপেনার তানজিদ হাসান খেলেন দুর্দান্ত শতরানের ইনিংস। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই পাওয়া এই শতকটি দেশের বাইরে কোনো বাংলাদেশি ওপেনারের শতকের তালিকায় তাকে পঞ্চম ক্রিকেটার হিসেবে জায়গা করে দেয়।
অধিনায়ক শান্তর ব্যাট থেকেও আসে গুরুত্বপূর্ণ ৮৪ রান। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৪ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে লেজের ব্যাটারদের নিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখার দায়িত্বটাও নিজের কাঁধে তুলে নেন মিরাজ। ৬৬ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে বাংলাদেশের জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে ফেরার পর দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য তানজিদ ব্যাট করার সুযোগ পাননি। শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক মিলে অনায়াসে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। ১৪.২ ওভারেই জয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
বিউ ওয়েবস্টারের বলে মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতে নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়। নির্ধারিত চা-বিরতির আগেই শেষ হয় ম্যাচ।
বাংলাদেশের এই জয়কে আলাদা করে তুলেছে তাদের ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ। ম্যাচের ১১টি সেশনেই অস্ট্রেলিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে বাংলাদেশ। কোনো পর্যায়েই স্বাগতিকদের ম্যাচে ফেরার মতো দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়নি তারা।
বাংলাদেশ এর আগেও বিদেশের মাটিতে স্মরণীয় টেস্ট জয় পেয়েছে। নিজেদের শততম টেস্টে কলম্বোয় শ্রীলঙ্কাকে হারানো, ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করা এবং ২০২৪ সালে পাকিস্তানকে তাদেরই মাঠে ২-০ ব্যবধানে সিরিজে হারানো—সবই ছিল ঐতিহাসিক অর্জন।
তবে এসব জয়ের কোনোটিতেই প্রতিপক্ষ পুরো ম্যাচজুড়ে নিষ্প্রভ ছিল না। ডারউইনে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের লাগাম ছিল বাংলাদেশের হাতে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। তৃতীয় ম্যাচেই সেই সাফল্য পেল তারা। সফরকারী দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট জয়ের জন্য এর চেয়ে কম ম্যাচ লেগেছে কেবল ইংল্যান্ডের—তারা দ্বিতীয় ম্যাচেই জয়ের দেখা পেয়েছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকাও তৃতীয় টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম জয় পেয়েছিল। পাকিস্তানের লেগেছিল সাত টেস্ট, ভারতের ১২টি। শ্রীলঙ্কা ১৫টি চেষ্টা করেও এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারেনি।
২০০৩ সালের পর এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নামা বাংলাদেশ তাই প্রথম সুযোগেই ইতিহাস গড়ল।
হাসান মাহমুদের পারফরম্যান্স ছিল ম্যাচের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। প্রথম ইনিংসে ৬-৫৫ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি আরও তিন উইকেট শিকার করেন। ম্যাচে তার মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯ উইকেট, ১১১ রানে।
অস্ট্রেলিয়ায় নিজের প্রথম টেস্টে কোনো সফরকারী বোলারের সেরা পারফরম্যান্সের তালিকায় এটি তৃতীয়। তার ওপরে আছেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম ও ইংল্যান্ডের মরিস টেট।
অন্যদিকে মিরাজের পাঁচ উইকেটও ছিল অনন্য। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি স্পিনার তিনি। এই নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে তার পাঁচ উইকেটের সংখ্যা দাঁড়াল ১৫।
এই জয়ের মাহাত্ম্য আরও বেড়ে যায় সাম্প্রতিক সময়ের কঠিন বাস্তবতার কারণে। অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে বাংলাদেশ নিজেদের সর্বশেষ টেস্টে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে আরও বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে ডারউইনে বাংলাদেশ দেখাল সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা—সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং আক্রমণাত্মক।
২০১৮ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারা চতুর্থ দলও হলো বাংলাদেশ। এর আগে ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড এই কীর্তি গড়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে এসেছিল সেই ঐতিহাসিক প্রথম জয়।
ডারউইনের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের নতুন ঘোষণা। ব্যাটিং, পেস, স্পিন, ফিল্ডিং—প্রায় প্রতিটি বিভাগেই অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।
আর অধিনায়ক শান্তর কথায় সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন—এটা হয়তো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়, কিন্তু শেষ নয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ডারউইনের রোববার তাই কেবল একটি জয়-উৎসবের দিন নয়। এটি এমন এক দিন, যেদিন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম কঠিন দুর্গে গিয়ে টাইগাররা নিজেদের সামর্থ্যের নতুন সীমা নির্ধারণ করল।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়—নয় উইকেটের ব্যবধানে। ইতিহাস এখন বাংলাদেশের।