
মো. জসীম উদ্দীন, রাজশাহী: ছয় কমিউনিটির মাঠতথ্যে উঠে এসেছে হারিয়ে যাওয়া স্থানীয় বীজ এবং অচাষকৃত খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদের সংকট।
বরেন্দ্র অঞ্চলের বর্ষাকালীন দেশি বীজবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষকের বীজ অধিকার এবং নারী কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান রক্ষায় জাতীয় বীজনীতি পর্যালোচনা ও সংস্কার, কৃষক-পরিচালিত কমিউনিটি বীজব্যাংক প্রতিষ্ঠা, কৃষক-কৃষক বীজ বিনিময়ের স্বীকৃতি এবং কৃষকের অধিকার বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন কৃষক, কৃষাণী, গবেষক, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
রোববার (১৭ আগস্ট ২০২৬) রাজশাহীর তানোর উপজেলার সিন্দুকাই গ্রামে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশনের আয়োজনে ‘বর্ষাকালীন দেশি বীজবৈচিত্র্য ও বীজ সার্বভৌমত্ব’ বিষয়ক কমিউনিটি-ভিত্তিক নীতি সংলাপে এ দাবি জানানো হয়।
কমিউনিটি-ভিত্তিক নীতি সংলাপে উপস্থাপিত একটি অংশগ্রহণমূলক মাঠ গবেষণায় রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলার ছয়টি কমিউনিটির বর্ষাকালীন বীজ বিনিময় উৎসবের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব উৎসবে স্থানীয় কৃষক-কৃষাণীরা নিজেদের বাড়িতে সংরক্ষিত বীজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন, পরস্পরের সঙ্গে বীজ বিনিময় করেন এবং আলোচনার মাধ্যমে বর্তমানে থাকা, হারিয়ে যাওয়া বা দুর্লভ হয়ে পড়া স্থানীয় বীজ ও উদ্ভিদের নাম চিহ্নিত করেন।
মাঠতথ্যে দেখা যায়, একই জাতের নাম হলেও একই ফসলের মধ্যেও রয়েছে বহু স্থানীয় জাত ও বৈশিষ্ট্য। বরেন্দ্র অঞ্চলে এখনো উল্লেখযোগ্য স্থানীয় বীজবৈচিত্র্য টিকে আছে। বিশেষ করে তানোরের সিন্দুকাই কমিউনিটিতে বর্ষাকালীন সবজির মধ্যে লাউয়ের চারটি, মিষ্টি কুমড়ার চারটি এবং শিমের চারটি স্থানীয় জাতের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া মরিচের তিনটি, ঝিঙা ও পাটশাকের দুটি করে এবং কচুর দুটি জাতের তথ্যও পাওয়া যায়।
থানতলা কমিউনিটিতে কুমড়া, লালশাক, খাটোশিম, লম্বাশিম, কাঠরাশিম, লাউ, বরবটি, চিচিঙ্গা, তেলাকুচা, করলা, গড়আলু, জিরাধান ও বিআর-২৬ ধানসহ বিভিন্ন স্থানীয় বীজের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, গোকুল মথুরা কমিউনিটিতে স্থানীয় খাদ্য, ঔষধি ও অচাষকৃত উদ্ভিদের ২৯টি এবং মোহর হিন্দুপাড়ায় ২৭টি স্থানীয়ভাবে হারিয়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া উদ্ভিদের নাম কৃষকদের স্মৃতি ও আলোচনায় উঠে এসেছে।
তবে অংশগ্রহণমূলক এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী কৃষক ও গবেষকেরা সতর্ক করে বলেন, এসব সংখ্যা জাতীয় পর্যায়ে বিলুপ্তির পরিসংখ্যান নয়। এগুলো সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির মানুষের স্থানীয় জ্ঞান ও স্মৃতিতে বর্তমানে অনুপস্থিত বা দুর্লভ হয়ে যাওয়া উদ্ভিদ ও বীজের তথ্য।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী হরিদেবপুর এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারের পরিচালনাকারী কৃষাণী মোছা. কবুলজান বলেন, তাঁদের এএলসিতে বিভিন্ন শস্য ও ফসলের ১৬০টি জাতের জীবন্ত বীজ রয়েছে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসব বীজ সংগ্রহ করে রাখা হয় এবং মৌসুমভিত্তিক বীজ বিনিময় করা হয়।
ছয়টি গ্রামের বীজ মেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে জানা যায়, নারীরাই স্থানীয় বীজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক। কমিউনিটি-ভিত্তিক এই নীতি সংলাপে উপস্থাপিত গবেষণায় নারী কৃষকের ভূমিকা বিশেষভাবে উঠে আসে। মাধবপুরে ৪০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৩৮ জন, দুবইলে ৫৫ জনের মধ্যে ৪০ জন এবং সিন্দুকাইয়ে ৬০ জনের মধ্যে ৫০ জন ছিলেন নারী।
বক্তারা বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নারীরা শুধু বীজ সংরক্ষণই করেননি; কোন গাছ থেকে বীজ নিতে হবে, কখন সংগ্রহ করতে হবে, কীভাবে শুকাতে ও সংরক্ষণ করতে হবে এবং কোন বীজ পরবর্তী মৌসুমে ব্যবহারযোগ্য—এসব লোকায়ত জ্ঞানও ধারণ করে আসছেন। তাই নারী কৃষককে শুধু কৃষি কর্মসূচির ‘উপকারভোগী’ হিসেবে না দেখে স্থানীয় বীজের জ্ঞান ও সংরক্ষণের রক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
দুটি উপজেলার ছয়টি গ্রামের অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বীজ হারানো মানে শুধু একটি জাত হারানো নয়। স্থানীয় বীজের সংকটকে শুধু কৃষি উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। কারণ বীজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কৃষকের উৎপাদন-স্বাধীনতা, খাদ্য নির্বাচনের অধিকার, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি, কৃষিজীববৈচিত্র্য, নারী কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান এবং স্থানীয় পরিবেশগত জ্ঞান।
গোকুল মথুরা গ্রামের কৃষক জিতেন্দ্র নাথ বলেন, “আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চল খরাপ্রবণ। এই জাতগুলো এই অঞ্চলের সঙ্গে খাপ খেয়ে নিতে পারে। তাই এসব জাত জাতীয়ভাবে সুরক্ষা করা উচিত।”
কৃষকদের আলোচনায় স্থানীয় বীজ কমে যাওয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও হাইব্রিড বীজের বিস্তার, বাজারনির্ভরতা, একমুখী চাষ, রাসায়নিক কৃষি ও হার্বিসাইডের ব্যবহার, কৃষি-ইনপুট কোম্পানির প্রচারণা এবং স্থানীয় বীজ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
নীতি সংলাপে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বীজ ব্যবস্থায় বীজের মান, উৎপাদন, বিপণন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনগত কাঠামো রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে বীজ আইন, ২০১৮ এবং বীজ বিধিমালা, ২০২০ রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এখন প্রয়োজন কমিউনিটি বা অঞ্চলভিত্তিক বীজ ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা।
অর্থাৎ শুধু কোন বীজ বাজারে বিক্রি হবে তা নয়; বরং কে বীজ সংরক্ষণ করবে, কে বিনিময় করবে, কার জ্ঞান স্বীকৃতি পাবে এবং স্থানীয় বীজবৈচিত্র্য কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হবে—এসব প্রশ্নকেও জাতীয় বীজনীতির অংশ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বলেন, বীজ নীতিমালা এবং এ-সংক্রান্ত আইনগুলোতে কমিউনিটি-ভিত্তিক কৃষক-কৃষাণীর বীজ সংরক্ষণ ও জ্ঞানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, হাজার বছরের বীজবৈচিত্র্য সুরক্ষায় কৃষকেরাই অবদান রেখেছেন। কমিউনিটি-ভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক দেশি বীজবৈচিত্র্য সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত করতে হবে এবং সেগুলোর এলাকাভিত্তিক উৎপাদন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি গবেষকদেরও স্বীকৃতি দিতে হবে।
কমিউনিটি-ভিত্তিক এই নীতি সংলাপে দুটি উপজেলার ছয়টি কমিউনিটির বর্ষাকালীন বীজ বিনিময় উৎসবের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।
কমিউনিটি-ভিত্তিক এই নীতি সংলাপে স্থানীয় কৃষক-কৃষাণীরা আট দফা নীতিগত দাবি তুলে ধরেন।
নীতি সংলাপ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলো হলো—
১. জাতীয় বীজনীতির অংশগ্রহণমূলক পর্যালোচনা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য, এগ্রোইকোলজি, কৃষকের অধিকার এবং কমিউনিটি বীজ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় জাতীয় বীজনীতির পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
২. কৃষক-নেতৃত্বে পরিচালিত কমিউনিটি বীজব্যাংক প্রতিষ্ঠার জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় কৃষক, বিশেষত নারী কৃষকের নেতৃত্বে বীজব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে হবে।
৩. কৃষক-কৃষক বীজ বিনিময়ের স্পষ্ট নীতিগত স্বীকৃতি দিতে হবে।
অ-বাণিজ্যিক কৃষক-কৃষক বীজ বিনিময়ের জন্য সহজ ও কৃষকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৪. কমিউনিটি বা কৃষকের জাত সুরক্ষায় রেজিস্টার চালু করতে হবে।
স্থানীয় কৃষকের সংরক্ষিত জাতগুলোর তালিকা ও সংরক্ষণ-অবস্থা নথিভুক্ত করতে হবে।
৫. নারী ও পুরুষ কৃষকদের মাধ্যমে দেশি বীজ সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয় বীজ সংরক্ষণকারী নারী কৃষকদের স্বীকৃতি, কৃষক-কৃষক প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।
৬. হারিয়ে যাওয়া বীজ ফিরিয়ে আনা বা পুনরুদ্ধারের কর্মসূচি চালু করতে হবে।
স্থানীয়ভাবে হারিয়ে যাওয়া বা দুর্লভ হয়ে যাওয়া বীজ ও উদ্ভিদ অন্য এলাকায় অনুসন্ধান, সংগ্রহ ও পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
৭. অচাষকৃত খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদের কমিউনিটি প্রাণবৈচিত্র্য রেজিস্টার তৈরি করতে হবে।
হেলেঞ্চা, গীমা, বনপুঁই, বনপাট, নিশিন্দা, কুঠিরাজসহ স্থানীয় খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদকে কৃষি, খাদ্য ও ঔষধি প্রাণবৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে নথিভুক্ত করতে হবে।
৮. বীজবৈচিত্র্যকে জলবায়ু অভিযোজনের সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, বীজ বিনিময়, কমিউনিটি বীজব্যাংক, নারী বীজ সংরক্ষণকারী এবং হারানো বীজ পুনরুদ্ধারকে জলবায়ু অভিযোজন ও এগ্রোইকোলজি কর্মসূচির পরিমাপযোগ্য সূচক করতে হবে।
নীতি সংলাপে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রিটি অন প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস ফর ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার’ (ITPGRFA)-এর স্বাক্ষরকারী দেশ। ট্রিটির আর্টিকেল ৯-এ কৃষকের অধিকার, লোকায়ত জ্ঞান এবং উদ্ভিদ জেনেটিক সম্পদ (Plant Genetic Resources) সংরক্ষণে কৃষকের অবদানের বিষয়টি স্বীকৃত। তাই বাংলাদেশের জাতীয় বীজব্যবস্থায় কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ, স্থানীয় জাত রক্ষা, বীজ বিনিময় এবং বীজ-সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃষকের অংশগ্রহণকে আরও কার্যকরভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
নীতি সংলাপের বক্তারা বলেন, বীজকে শুধু কৃষি উপকরণ হিসেবে দেখা যাবে না। বীজ কৃষকের অধিকার, প্রাণবৈচিত্র্য, খাদ্য সার্বভৌমত্ব এবং জলবায়ু অভিযোজনের সম্পদ। যে কৃষক বীজ বাঁচান, তিনি শুধু একটি জাত বাঁচান না; তিনি একটি খাদ্যব্যবস্থা, একটি জ্ঞানব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার বাঁচান।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, “আমাদের বীজ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে; এখন প্রয়োজন কৃষকের বীজ সার্বভৌমত্বের শাসনব্যবস্থা।”
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন সিন্দুকাই নারী সংগঠনের সভাপতি পরি টুডু, আদিবাসী নেতা গনেস সরেন, বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত কুমার সরকারসহ অনেকে।