
সংসদে ২৫৫ ভোটে বড় জয়; অলি আহমদ পেলেন ৮৮
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ফলে ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন মির্জা ফখরুল।
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর গণনা শেষে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ফল ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। পরে নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
৩৪৯ ভোটারের মধ্যে ভোট ৩৪৩ জনের
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ছিলেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য। তাঁদের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন। ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট দেননি। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে পড়া সব ৩৪৩টি ভোটই বৈধ হয়েছে।
ভোটের হিসাবে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন মোট বৈধ ভোটের প্রায় ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে অলি আহমদ পেয়েছেন প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট। সংখ্যার ব্যবধান ১৬৭—যা এবারের নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ব্যবধানও তুলে ধরেছে।
দুপুরে শুরু, বিকেলে ফল
বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার কিছু পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোট চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। শুরুতেই ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান ভোট দেন। এরপর নিজের ভোট দেন রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তবে নির্বাচনের প্রার্থী অলি আহমদ নিজে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি—কারণ তিনি সংসদ সদস্য নন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার কেবল সংসদ সদস্যরা।
দুই প্রার্থীর লড়াই
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন দুজন। ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় দলের জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য তাদের প্রার্থী করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে। উভয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।
ফল ঘোষণার পর জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানান সংসদ সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান তাঁর আসন থেকে উঠে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে করমর্দন করেন এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে করমর্দন ও আলিঙ্গন করে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
সংবিধানের নিয়মে দলীয় সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ জনগণ সরাসরি ভোট দেন না। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। এ কারণে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ রাখেন। এবারের নির্বাচনে ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট না দেওয়ায় মোট ৩৪৩টি ভোট গণনায় আসে।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থীর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
I
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ফলাফলে বড় ব্যবধানেই জয় পেয়েছেন মির্জা ফখরুল। তাঁর ২৫৫ ভোটের বিপরীতে অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন দায়িত্ব
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই নেতা এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সামনে থাকবে সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার বড় দায়িত্ব।
নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে। এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ ও আগামী দিনের ভূমিকার দিকে।
এক দিনের ভোটে শেষ হয়েছে ৩৫ বছরের অপেক্ষা। ২৫৫ ভোটের জয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর যাত্রা শুরু হলো নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
:::