
মুলাদী (বরিশাল) প্রতিনিধি: মেধা ও সাফল্যের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞান, মানবিকতা ও দেশপ্রেমে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে বরিশালের মুলাদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২৬’। মুলাদি ফোরাম, ঢাকার উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপজেলার এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় এ+ পাওয়া এবং পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় মুলাদীর শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে তাদের হাতে সম্মাননা হিসেবে সার্টিফিকেট ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুলাদি ফোরাম, ঢাকার সভাপতি ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন অলি। প্রধান অতিথি ছিলেন মুলাদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম সরওয়ার।
অনুষ্ঠানে মুলাদির কৃতী সন্তান হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবকসহ বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সফল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফল তার একার অর্জন নয়। এর পেছনে থাকে বাবা-মায়ের ত্যাগ, শিক্ষকের শ্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং সমাজের প্রত্যাশা। সেই অর্জন যখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়, তখন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়ে, তেমনি আরও ভালো করার প্রেরণাও তৈরি হয়।
‘কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২৬’ মূলত সেই স্বীকৃতিরই একটি আয়োজন। এসএসসি ও দাখিলে এ+ এবং পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের একই মঞ্চে সম্মানিত করার মাধ্যমে মুলাদি ফোরাম শিক্ষার প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সাফল্য সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানান। জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, দেশপ্রেম ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে নিজেদের গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একজন কিশোর বা তরুণ শিক্ষার্থীর সামনে যখন নিজের এলাকার সফল মানুষদের জীবন ও কর্মের উদাহরণ তুলে ধরা হয়, তখন তার ভবিষ্যৎ ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, অধ্যাপক, প্রশাসক, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজসেবী—বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত মুলাদির সন্তানদের উপস্থিতি তাই অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
তাদের সাফল্যের গল্প শিক্ষার্থীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেয়—নিজ এলাকার মাটি থেকে উঠে এসেও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। প্রয়োজন অধ্যবসায়, সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলা।
সার্টিফিকেট-ক্রেস্টের চেয়েও বড় অনুপ্রেরণা
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার সময় ছিল আনন্দঘন পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও ছিল গর্ব ও সন্তুষ্টির অনুভূতি।
একটি ক্রেস্টের বস্তুগত মূল্য হয়তো সীমিত; কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর কাছে এর প্রতীকী মূল্য অনেক বেশি। এটি তার পরিশ্রমের স্বীকৃতি, পরিবারের আনন্দের স্মারক এবং ভবিষ্যতে আরও বড় অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম সরওয়ারের উপস্থিতি আয়োজনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে সম্মাননা গ্রহণ শিক্ষার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার মতো আয়োজনে প্রশাসন, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, সামাজিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ শিক্ষার পরিবেশকে আরও ইতিবাচক করতে পারে। মুলাদি ফোরামের এই উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ঢাকাস্থ মুলাদিবাসীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা
কর্মজীবন ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজ এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এমন আয়োজন করা ঢাকাস্থ মুলাদিবাসীদের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি প্রকাশ। একটি অঞ্চলের সফল মানুষরা যখন পরবর্তী প্রজন্মের পাশে দাঁড়ান, তখন সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের যোগাযোগ ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের নতুনভাবে ভাবার সুযোগ করে দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়—সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিজ্ঞান, দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানবিক মূল্যবোধও একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃতি শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি তাদের সামনে একটি বৃহত্তর লক্ষ্য তুলে ধরাও জরুরি।
‘কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২৬’ সেই লক্ষ্যেই একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। অনুষ্ঠানের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—মুলাদির শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকশিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে।
আজ যে শিক্ষার্থী একটি ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে আনন্দিত, আগামী দিনে সে-ই হয়তো প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হয়ে মুলাদির নাম উজ্জ্বল করবে।
সেই অর্থে ‘কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২৬’ কেবল একটি সম্মাননা অনুষ্ঠান নয়; এটি মেধার স্বীকৃতি, শিক্ষার প্রতি সামাজিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর একটি প্রয়াস।
মুলাদি ফোরাম, ঢাকার এই আয়োজন যেন একটি প্রত্যাশাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে—মুলাদির প্রতিটি মেধাবী শিক্ষার্থী তার প্রতিভা ও যোগ্যতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে, আর তাদের সাফল্যের পথে পাশে থাকবে নিজ এলাকার মানুষ।
সার্টিফিকেট ও ক্রেস্ট তাই কেবল একটি অনুষ্ঠানের স্মারক নয়; এগুলো হয়ে উঠুক নতুন স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক।