
গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি
এমএম রহমাতুল্লাহ: গুম অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তা গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে গুমের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
দলটি বলেছে, দেশে গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান ঘটাতে হলে শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়ন, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গুমের নির্দেশদাতাসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসাইন মানিক মিয়া হলে এবি পার্টি আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহিতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। দলের ছায়া সরকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ওহাব মিনার।
সেমিনারে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস দীর্ঘ। মুজিব আমল থেকে বিভিন্ন সময়ে মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো জহির রায়হানকে পাইনি।’
গুমের সংস্কৃতির অবসানের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশে আমরা আর গুম দেখতে চাই না।’ প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, নতুন আইনে কিছু নতুন বিষয় থাকলেও এটি অনেকাংশে ২০০৯ সালের আইনের মতো মনে হচ্ছে।
গুমসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।
সেমিনারের সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. ওহাব মিনার বলেন, ৫ আগস্ট ডিফেন্স ফোর্স জনগণের পক্ষে না দাঁড়ালে বাংলাদেশে গণহত্যার ভয়াবহতা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারত। গুমের শিকার ব্যক্তিদের দুঃসহ স্মৃতি এবং তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, গুমের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে আর ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার আলোকে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান হচ্ছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ সংকট সমাধানে জাতীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু কমিটি গঠন করলেই হবে না; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় থাকতে হবে।
গুম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা গুমের সংস্কৃতির অবসান চাই। আমরা আর সেই জায়গায় ফিরে যেতে চাই না।’ দুর্বল পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে গুমের মতো গুরুতর অপরাধের কার্যকর তদন্ত ও বিচার সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এফএসডিএসের চেয়ারম্যান ফজলে এলাহী আকবর গুমের বিষয়টি তদন্তে বর্তমান সরকারের কমিটি গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন ইস্যুতে গঠিত কমিটির ব্যর্থতার বহু নজির রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিগত হাসিনা সরকারের সময়ে ডিফেন্সের লোকজন গুম-খুনে জড়িত ছিল—এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। একটি দেশের সেনাবাহিনী যখন জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো না গেলে ভবিষ্যতে নতুন করে পুশইনের আশঙ্কা রয়েছে।
রাখাইনে নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তাঁদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণেও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানোর অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের আগে ব্যাপক গবেষণা করা হয়েছে। যার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করা হবে না। পাশাপাশি গুমের নির্দেশদাতারাও যাতে বিচারের আওতায় আসেন, সে বিষয়টি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে।
নিজের গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে নিখোঁজ করে না; এর সঙ্গে একটি পরিবারকে দীর্ঘদিন আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
সেমিনারে বক্তারা গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গুমের নির্দেশদাতা ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ইঞ্জিনিয়ার শাহেদ আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, রিপন মাহমুদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, নারী উন্নয়ন বিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক সহসম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব রাশিদা আক্তার মিতু এবং রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী।
এ ছাড়া সেমিনারে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, গবেষক, আইনজীবী, পেশাজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।