
জাকির ফরাজীঃ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ এবং তাদের সন্ধান ও গুম প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়। দিনটি এলেই স্মরণে আসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের কথা। নিখোঁজ হওয়ার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তাদের সন্ধান পায়নি পরিবার।
২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নিখোঁজ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের আল ফিকহ্ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ এবং আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাস। তারা দুজনই ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় যান মুকাদ্দাস। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি বন্ধু ওয়ালিউল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। স্বজনদের দাবি, বাসটি রাত ১২টার দিকে সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি বাসে ওঠেন। তারা মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকেই তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের চাচা আবদুল হাই ঢাকার দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অন্যদিকে, ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ ৮ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়া থানায় জিডি করেন।
পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান না পেয়ে দুই শিক্ষার্থীর পরিবার হাইকোর্টে পৃথক রিট করেন। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে আদালত তাদের কেন সশরীরে হাজির করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজিপিসহ নয় কর্মকর্তার প্রতি রুল জারি করেন।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালতকে জানান, তারা দুই শিক্ষার্থীর কোনো সন্ধান পাননি। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর ৯ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে লিভ টু আপিলের নির্দেশ দেন। পরবর্তী শুনানি শেষে হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে রিট খারিজ করে দেওয়া হয়।
ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের নিখোঁজের ঘটনাটি ২০১২ সালে বাংলাদেশে গুমের অভিযোগগুলোর মধ্যে আলোচিত হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সংশ্লিষ্ট কার্যকরী দলও বাংলাদেশে গুম হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইবি শাখার তৎকালীন অর্থ সম্পাদক এবং আল-মুকাদ্দাস সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
ইবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, ২০১২ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় তাদের গুম করা হলেও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও তাদের সন্ধান মেলেনি। তিনি এটিকে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার এবং দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সন্তানদের অপেক্ষায় থাকা অসুস্থ বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে কোনো নাগরিক যেন গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার না হন, সে বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, সরকার এ ব্যাপারে কাজ করছে। আশা করি, এ বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নেবে।