
কল্লোল আহমেদ, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়া, ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষক-কৃষাণীরা। দীর্ঘদিন ধরে সার নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত মহাসড়কে নেমে বিক্ষোভ করতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকায় বাফা (বাংলাদেশ এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন) গুদামের সামনে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করেন শতাধিক কৃষক। এ সময় তারা সার সরবরাহ নিশ্চিত, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা অবরোধে মহাসড়কের উভয় পাশে শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী, স্থানীয় যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নিলে বেলা ১১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, আমন ধানের ভরা মৌসুমে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন ডিলারের কাছে ঘুরেও তারা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সার পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, ডিলারদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে সার মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি মূল্যে প্রকৃত কৃষকেরা সার না পেলেও অতিরিক্ত টাকা দিলে কালোবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক নজরুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। এখন আমনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। সময়মতো সার দিতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপর কৃষক বদিয়ার রহমান (৬০) বলেন, সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সারের সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কিন্তু ডিলারের দোকানে গেলে গুদামে সার নেই বলে জানানো হচ্ছে। অথচ বেশি দাম দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অবরোধ চলাকালে কয়েকজন বিক্ষুব্ধ কৃষক কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মী ও এক সার ডিলারকে ধাওয়া করেন। পরে তারা স্থানীয় একটি পেট্রোল পাম্পে আশ্রয় নিলে কৃষকেরা সেখানে গিয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
কৃষকদের অভিযোগ, সার নিয়ে সংকটের বিষয়টি তারা আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের অবহিত করলেও কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ক্ষোভ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই তারা মহাসড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেন।
এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান এবং জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিযোগ শোনেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হলে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নেন।
জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। তবে বিতরণ ব্যবস্থার কিছু ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সার বিতরণ শুরু করা হয়েছে। সার বিতরণে অনিয়ম, অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা সিন্ডিকেটের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে কৃষকদের প্রশ্ন, জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকার পরও কেন তারা দিনের পর দিন ডিলারের দোকানে ঘুরে সার পাচ্ছেন না? সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা আগে থেকেই কেন বন্ধ করা গেল না? কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত নজরদারি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষি খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই এবার সার সরবরাহ ও ডিলারদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগ সামনে এনে কৃষকদের মহাসড়কে নামার ঘটনায় স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে সার বিতরণের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আমন মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সার সরবরাহের ওপর কঠোর নজরদারি, প্রকৃত কৃষকের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো এবং মজুতদারি ও কালোবাজারির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাদের ভাষ্য, কৃষকের উৎপাদন নির্ভর করে সময়মতো সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ পাওয়ার ওপর। প্রশাসনের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও যদি সমাধান না মেলে, তাহলে কৃষককে মহাসড়কে নেমে প্রতিবাদ করতে হবে কেন—এ প্রশ্নের জবাবও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।