
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা ৬টি দাবি নিয়ে লংমার্চ করেছি। দ্বিতীয় লংমার্চে আমরা ৮ দফা দিয়েছি। এসব দাবি ১৮ কোটি জনগণের দাবি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভোটে হ্যাঁ তে ভোট দিতে বলেছিলেন, কিন্তু তিনি গণভোটের রায় মানেননি, অগ্রাহ্য করেছেন।
আজ ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার রাতে রংপুরের জিলা স্কুল মাঠে জামায়াতের নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ বহর নিয়ে রাত ৯টার দিকে সমাবেশে যোগ দেয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা বলেন সংবিধানে গণভোট নেই। ফ্যাসিস্টদের সংবিধান অনুযায়ী আমরা তাড়ায়নি। সংবিধানের বাইরে গিয়ে ফ্যাসিস্টদের তাড়ানো হয়েছে। যদি সংবিধানে গণভোট না থাকে তাহলে ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচন নেই। কোনো সরকারও নাই। মানলে সবটা মানতে হবে। বাদ দিলে সবটা বাদ দেয়ার ঘোষণা দিতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেছিলেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে যে নামেই হোক। কিন্তু ৭ মাস চলে গেল নড়াচড়া দেখি না। কোন দিক থেকৈ কি পানি পড়া খেলেন আপনাদের কণ্ঠে জোর দেখি না। জনগণকে বারবার ধোকা দেয়ার চেষ্টা করবেন না। আমরা বলেছিলাম যদি নির্বাচিত করেন আল্লাহ তাহলে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো।
আমরা বলেছিলাম গোটা উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষির রাজধানী বানাবো। নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে দেবো।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আপনাদের পছন্দের দলগুলোকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যায্য ফলাফল জাতির স্বার্থে মেনে নিয়েছিলাম। বিএনপি দফায় দফা জাতির সাথে ওয়াদা দিয়ে তারা ত সব ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। এখন তারা উল্টো রথে চলছেন। যেই পথে হাসিনা চলে ফ্যাসিবাদ কা স্পষ্টত দেখছি সেই পথেই হাঁটছে এই সরকার। যদি একই পথে হাঁটেন তাহলে পরিণতি একই হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা ৮ দফা দিয়েছি, এগুলো জনগণের দাবি। বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটে ভুগছে মানুষ। সার পায়না কৃষকরা , কাজ পায়না মানুষ। কিন্তু একটি দলের লোকেরা কাজ পায়। সেই কাজ হলো চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজদের জ্বালায় জাতি অস্থির। চাঁদাবাজদের কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের জীবন দুর্বিষহ, অনেকের জীবনও যাচ্ছে। এমনকি পরে মানুষ যখন না পায়, নিজের মানুষকে পাথর মেরে হত্যা করে।, তারা সন্ত্রাসী। সিরাজগঞ্জে আজ ১১ দলের এক কর্মীকে কুপিয়ে আহত করার বিষয় উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি আর যদি এ ধরনের হামলা করা হয় তাহলে ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে সন্ত্রাসীরে কালো হাত ভেঙে দেয়া হবে।
শহীদ আবু সাঈদকে স্মরণ করে তিনি বলেন,সরকার জাতির সাথে প্রতারণা করলে আমরা করব না, ঈমানদারীর সাথে থাকবো। এ সরকার নির্বাচনের আগে বলেছিল তারা কোরআন সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করবে না। ইতোমধ্যে কুরআন সুন্নাহবিরোধী সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস করেছে। যদি এ আইন করা হয় তাহলে বাংলাদেশের মুসলমানরা বসে থাকবে না। এ আইনের কারণে ঘরে ঘরে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। হারাম আইন প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি জাতির সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করার লংমার্চ করতে হচ্ছে। সমস্ত অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে, আমরা বিশ্রাম নেবো না। আমরা নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। সে অধিকার আদায় করে ঘরে ফিরবো। জাতির প্রয়োজনে আট দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে।
আমীর জামায়াত বলেন, সংসদের ভিতর তীব্র প্রতিবাদ চলবে, রাজপথে আন্দোলন চলবে। আন্দোলনের মধ্যদিয়ে জনগণের দাবি আদায় করা হবে। যে আন্দোলনে মায়েরা নেমেছেন সে আন্দোলন সফল হবে। জীবন যাবে জুলাই দেবো না। জুলাই বাস্তবায়ন হবে। দুর্নীতিমুক্ত ও আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ হবে ।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার পাইনি। বিচার করতে হবে। যারা দেশে নাই তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হচ্ছে। দেশে যারা আছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা রায় দেখতে চাই।
তিনি বলেন, ১১ দলের আট দফা বাংলাদেশকে মুক্তি দিতে পারবে। আমরা দেশের নিরাপত্তা চাই, শিশুদের নিরাপত্তা চাই। সিরাজগঞ্জে ১১ দলের এক কর্মীকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। আর যদি একটি হামলা করা হয় তাহলে পাল্টা আঘাতের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। বিরোধী দল দমনের চেষ্টা ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ।
এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, তিস্তা নদী শাসন করতে হবে। এটি হিন্দুস্থানের সমস্যা নয়। আমরা চাই না হিন্দুস্থারে ক্ষতি হোক, তাদেরও উচিত বলা যাতে আমাদের দেশের ক্ষতি না হয় । তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনার পাশের লোকদের কথা শুনবেন না, দেশের মানুষের কথা শুনতে হবে।
এ ছাড়াও বক্তব্যা রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ; মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, ভারপ্রাপ্ত আমীর, নেজামে ইসলাম পার্টি; জনাব মো. আখতার হোসেন এমপি, সদস্য সচিব, জাতীয় নাগরিক পাটি (এনসিপি); মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী;মজিবুর রহমান মঞ্জু, চেয়ারম্যান, আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি), মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ, মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস; ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ লেবার পার্টি; ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, সহ সভাপতি ও মুখপাত্র, জাতীয় গণতান্ত্রিক পাটি(জাগপা); এড. এ.কে.এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি; মাওলানা আবদুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; জনাব সারজিস আলম, মূখ্য সংগঠক উত্তর অঞ্চল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি); প্রফেসর ওমর ফারুক, প্রেসিডিয়াম সদস্য, লিবারেল ডেমোক্রাটিক পার্টি (এলডিপি); মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বংলাদেশ খেলাফত মজলিস; মুফতি ফখরুল ইসলাম, মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন; সিবগাতুল্লাহ সিবগা, সেক্রেটারী জেনারেল, বংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির; জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সহকারী অঞ্চল পরিচালক রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল, মাওলানা মমতাজ উদ্দিন; অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল, মাননীয় সংসদ সদস্য, রংপুর-৩(রংপুর সদর ও সিটি; সাবেক মজলুম ছাত্রনেতা মো: দেলওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির; উপাধ্যক্ষ মাওলানা এ.টি.এম আজম খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও আমীর, রংপুর মহানগরী, অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, মাননীয় সংসদ সদস্য, রংপুর-৫(মিঠাপুকুর) কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও জেলা আমীর, রংপুর।
এর আগে লাখো জনতার উপস্থিতিতে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশ করে। এতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ শেষে সকাল ৮টার দিকে লংমার্চের বহর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। হাজার হাজার নারী পুরুষ গোটা সড়ক পথে ফুল ও স্লোগান দিয়ে অভিবাদন জানায়।
গাজীপুরের পথসভা শেষে লংমার্চের বহর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস; টাঙ্গাইলের নগর জলফৈ বাইপাস রোড; সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়; বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভায় যোগ দেবে এবং সবশেষ রংপুরের জিলা স্কুল মাঠে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও লংমার্চ রুটের বিভিন্ন স্থানে গণজমায়েত স্থলে অনানুষ্ঠানিক পথসভায় যোগ দেয় এবং রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সংগঠনের ১১ দলের নেতাকর্মীদের দেয়া অভিবাদন গ্রহণ করে লংমার্চের বহর।