
ফিরোজ মাহবুব কামাল
ক্ষুধার্ত শকুন: গণতন্ত্র হত্যায় তারেক জিয়া
২০২৪'য়ের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশীদের যে নতুন স্বাধীনতা মিললো – সে স্বাধীনতা এখন চরম সংকটে। সেটি যখন তখন আবার হারিয়ে যেতে পারে। সে সম্ভাবনা এখন প্রচুর। কারণ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শত্রুরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছে। বুঝতে হবে, শত্রুরা কখনো বসে থাকে না। যুদ্ধ না থাকলে তারা সারাক্ষণ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকে নতুন হামলার। এটিই শত্রুদের নীতি।
বিশাল এক পাল শকুন বাংলাদেশের ভিতরে এবং বাইরে বসে আছে; তারা বসে আছে গণতন্ত্র কখন লাশ হবে সে অপেক্ষা। গণতন্ত্র লাশ হলে আবার ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার ফিরে আসবে; দেশটাকে আবার লুটে পুটে খাবে। পরিতাপের বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন বিএনপি নিজেই শকুনদের খায়েশ মেটাতে গণতন্ত্রকে দ্রুত লাশ করে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে। সেটি সংবিধান সংস্কারের পক্ষে শতকরা ৭০ ভাগ গণরায়কে প্রত্যাখান করে। গণরায়ের সাথে বিএনপি’য়ের এ প্রতারণা বিরোধী দলের সাথে তারেকে জিয়ার সরকারের সংঘাত অনিবার্য করে তুলেছে। তাঁর এ প্রতারণা তাঁর অযোগ্যতাকে ম্লান করে দিয়েছে।
নিজের গদি বাঁচাতে তারেক জিয়ার যুদ্ধ এখন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে। বিএনপি গণতন্ত্রকে অসম্ভব করছে শুধু জনগণের শতকরা ৭০ ভাগ রায়কে অমান্য করে নয়, বরং দেশে সুশাসনকে অসম্ভব করে। সেটি করছে হাজার হাজার দলীয় সন্ত্রাসী চাঁদাবাজকে দেশের হাটে বাজারে অবাধ ছেড়ে দিয়ে। এরা ডাকাত। চাঁদাবাজীর অর্থ প্রকাশ্য ডাকাতি। ডাকাতরা ডাকাতি করে রাতের আঁধারে নিজেদের লুকিয়ে, কিন্তু চাঁদাবাজরা ডাকাতি করে দিন দুপুরে জনগণের চোখের সামনে।
চাঁদাবাজ মাত্রই যেহেতু সরকারি দলের, তাদের তাণ্ডবে পুলিশ নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সমগ্র প্রশাসন নিষ্ক্রিয়। দেশ জুড়ে আইন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। জনগণ তাই আইন নিজ হাতে তুলে নিয়েছে; অপরাধীদের শাস্তি দিতে জনগণ তাদের ঘরবাড়ী নিজ হাতে ভাঙছে। সম্প্রতি পাবনায় এক ধর্ষককে তার বিল্ডিং ভেঙে শাস্তি দেয়ার চিত্রটা সোসাল মিডিয়ার দেখা গেল। দেখা গেল জনগণ উৎসব ভরে আইন ভাঙছে। এটি এক গুরুতর বিপদে সংকেত। এটি কোন সভ্য সংস্কৃতি নয়। সরকার এক্ষেত্র চরম অথর্ব।
তারেক জিয়ার পদত্যাগ কেন জরুরি?
আইন শৃঙ্খলার অবনতির সাথে দেশে তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মহা সংকট। দ্রব্যমূল্যের চরম উর্দ্ধগতি। জন জীবনে চরম হাহাকার। দেশ যে অচল হতে চলেছে -এটি তার স্পষ্ট আলামত। দেশ চালনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া যে চরম অযোগ্য -সেটি তিনি নিজেই প্রমাণিত করেছেন। অন্য যে কোন ব্যক্তির তুলনায় তারেক জিয়ার নিজের অযোগ্যতা প্রথমে নিজে বুঝা উচিত। তাঁর উচিত, নিজে দ্রুত পদত্যাগ করে দলের অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া। এতে তাঁর দল বাঁচবে এবং দেশও উপকৃত হবে। এটি নিশ্চিত যে, বিএনপি’তে তারিক জিয়ার চেয়ে অপেক্ষাকৃত যোগ্য বহু লোক আছে। ৬ মাসে তার যোগ্যতা বুঝা গেছে, তাকে আরো সময় দেয়ার অর্থ দেশকে ডুবতে দেয়া। কংগ্রস নেত্রী সোনিয়া গান্ধি ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল অবধি ১০ বছরের জন্য গান্ধি পরিবারের কোন অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা না দিয়ে ড. মনমোহন সিংয়ের ন্যায় অতি যোগ্য ব্যক্তির হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে কংগ্রসের ক্ষমতাকে বাঁচিয়েছিলেন এবং ভারতকে দিয়েছিলেন মুক্তি অর্থনীতির বিপ্লব। সে নীতি বিএনপি’রও হওয়া উচিত। তারেক জিয়াকে বুঝতে হবে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দলের চেয়ে দেশ বড়। তাই নিজ দল ও নিজ দেশের স্বার্থে কোন যোগ্য ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা দিয়ে তারেক জিয়ার পদত্যাগ করা উচিত।
গণতন্ত্র বাঁচে গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধ এবং সুশাসনের জন্য। তারেক জিয়া উভয় ক্ষেত্রেই ফেল করেছে। প্রশ্ন হলো, যে গণতন্ত্র তারেক জিয়ার ন্যায় এমন অযোগ্য লোকদের ক্ষমতায় বসায় -সে গণতন্ত্র কি কখনো নিজে বাঁচে? পাকিস্তান আমলে রাজনীতিবিদদের হাতে গণতন্ত্র বাঁচেনি বলেই দেশে সামরিক শাসন এসেছে। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সংসদের ডিপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলীকে কোন বস্তির নরপিশাচ গুণ্ডারা পিটিয়ে হত্যা করেনি। হত্যা করেছিল তথা কথিত শিক্ষিত(?) সংসদ সদস্যগণ নিজেরাই। বাঙালি সাংসদরা সেদিন ঢাকায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়িএ বিশ্বব্যাপী খবরের শিরোনামে এসেছিল। তারা সেদিন পাকিস্তানে গণতন্ত্র চর্চাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। তারিক জিয়াও তেমনি গণহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। সেটি সুশাসনে ব্যর্থ হয়ে, গণরায়কে উপেক্ষা করে এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।
ষড়যন্ত্রের পদধ্বনি
তারেক জিয়ার নিদারুন ব্যর্থতা ও প্রতারণার রাজনীতি খুনি হাসিনার নৃশংস ফ্যাসিবাদ এবং তার গণহত্যার অপরাধকে আড়াল করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে হাসিনার অনুসারীরা জোরে শোরে প্রচার শুরু করেছে খুনি হাসিনার আমলে নাকি সব কিছু ভাল ছিল। সেটি বাহানা বানিয়ে তারা হাসিনাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তাদের জন্য তারেক জিয়ার ব্যর্থ শাসন কাল হলো অতি প্রতীক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ। ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার প্রভু ভারত অধির আগ্রহে এমন সুযোগেরই অপেক্ষায়। ভারত সরকার যে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় বসাতে চায়; ভারত সরকারের সে গুপ্ত এজেন্ডাটি বিজেপির নেতারা বার বার প্রকাশ্যে বলছে। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দ্র অধিকারী সে এজেন্ডার কথা বহু বার বলেছে।
বুঝতে হবে, হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার ১৬ বছরে গড়া লক্ষ লক্ষ অনুসারীরা পালিয়ে যায়নি। তারা সাপের ন্যায় গর্তে ঢুকেছে, সুযোগ পেলে আবার বেরিয়ে আসবে। তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছে। হাসিনার অনুসারীরা বিপুল সংখ্যায় রয়ে গেছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, সিভিল প্রশাসন ও গোয়েন্দা দপ্তরে। বিশাল সংখ্যায় আছে মিডিয়াতেও। বিশাল সংখ্যায় অপেক্ষা করছে ভারতে। তাদের হাতে রয়েছে লুণ্ঠনকৃত হাজার হাজার কোটি টাকা। এরা সবাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন আবার ফিরিয়ে আনতে চায়। ইতিমধ্যে তারা রাস্তায় ঝটিকা মিছিল করা শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নাকি অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে মিছিল করতে রাস্তা ভাড়া দিচ্ছে। তারা রাস্তায় নেমে জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখছে। ইতিমধ্যে প্রচার শুরু হয়েছে, হাসিনা নাকি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসছে।
বিএনপি’র মধ্যে ইসলাম থেকে দূরে সরা সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট ও বামপন্থীদের সংখ্যাটি বিশাল। এরা বিএনপিতে এসেছে বামপন্থী ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে। তারা যেমন ইসলামবিরোধী, তেমনি তাদের রয়েছে প্রচণ্ড ইসলাম ভীতি। দেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের বিজয়ে -বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলির নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের নিরঙকুশ বিজয়ে তারা আতংকিত। তারা বুঝতে পেরছে, আগামী দিনের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদে মোকাবেলা করার সামর্থ্য তাদের নাই। আওয়ামী লীগেও সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট ও বামপন্থীদের সংখ্যাটি বিশাল। এদেরও রয়েছে চরম ইসলামভীতি। এদেরকে বিএনপির সেক্যুলারিস্ট ও বামপন্থীগণ ideological cousins মনে করে। শক্তিশালী ইসলামপন্থীদের মোকাবেলায় তারা উভয়ে কোয়ালিশন গড়বে সেটিই স্বাভাবিক। সেরূপ গোপন কোয়ালিশন ২০২৬’য়ের নির্বাচনে দেখা গেছে; ফলে আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপি পেয়েছে । অতএব এটি অমূলক নয় যে, বিএনপি’র প্রশ্রয়েই আওয়ামী লীগের কর্মীরা সম্প্রতি ঝটিকা মিছিলগুলি করেছে।
বিপ্লবের সুরক্ষায় জনগণের দায়
২০২৪’য়ের বিপ্লবের ফলে কথা বলার, লেখালেখি ও আন্দোলনের যে স্বাধীনতা মিলেছে সে বিপ্লবের রক্ষার দায় জনগণকেই নিতে হবে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে বাঁচাতে হলে ২০২৪’য়ের অর্জিত স্বাধীনতাকে কাজে লাগাতে হবে। নিজেদের প্রস্তুতি ও সংগঠিত করার কাজে এ সুযোগকে ব্যবহার করতে হবে।
তাই যারা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা বাঁচাতে চায় তাদের সবার উচিত নিজ নিজ সমর্থ্য নিয়ে ময়দানের সক্রিয় থাকা। এবং একতাবদ্ধ হওয়া। বুঝতে হবে গণতন্ত্র বাঁচাতে তারেক জিয়ার সরকারের কোন আগ্রহ নাই। যারা শতকরা ৭০ ভাগ জনগণের রায়ের সাথে প্রতারণা করে -তারা কি গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি হতে পারে? গণতন্ত্র বাঁচানোর এ যুদ্ধে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সৈনিক হতে হবে। রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির এ লড়াইয়ে ময়দান কখনো শূন্য রাখা যাবে না। ঘুমিয়ে গেলে স্বাধীনতা আবার হারাতে হবে। তখন হারানো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র আবার ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন হবে।
বুঝতে হবে, বিএনপি সরকারের যারা এখন ক্ষমতায় আসীন তারা এখন মন্ত্রীত্বের মজা উপভোগে ব্যস্ত। তারা ব্যস্ত চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি নিয়ে। স্বাধীনতা বাঁচানো নিয়ে তাদের আগ্রহ নাই। কোন তাড়নাও নেই। তাই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বাঁচানোর দায় খোদ জনগণকেই নিতে হবে। বিশেষ করে এ দায় সর্বাধিক তাদের যারা নিজেদের ঈমানদার ও ইসলামী মনে করে। কারণ এ স্বাধীনতা বিলুপ্ত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যারা ইসলামকে ভালোবাসে।
বুঝতে হবে, মুসলিম জীবনে যুদ্ধ প্রতিক্ষণ। কারণ ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুর যুদ্ধটি প্রতিক্ষণ। তাই মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো সৈনিক হওয়া। যারা সৈনিক হতে ব্যর্থ হয়, বুঝতে হবে তারা মুসলিম হতে ব্যর্থ হয়েছে। বুঝতে হবে বাংলাদেশ এক বিশাল ইসরাইল দ্বারা পরিবেষ্টিত। সে ইসরাইলের নাম ভারত। এ মুহূর্তে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত না হলে এবং সতর্ক না হলে বাংলাদেশও ফিলিস্তিন হবে। একবার ভারতের পেটি গেলে আফসোস করে কোন লাভ হবে না। বুঝতে হবে এ লড়াই দেশ বাঁচানোর। তাই যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়ে এ লড়াইয়ে থাকতেই হবে। মুসলিম জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। ২০/০৯/২০২৬