
শেখবাজকে ‘দারুণ মানুষ’ বললেন ট্রাম্প, তেহরান-ওয়াশিংটনের বৈঠকে নতুন আশার সঞ্চার
নিউইয়র্ক থেকে বিশেষ প্রতিবেদন: জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছে পাকিস্তান। নিউইয়র্কে মঙ্গলবার দিনভর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের ধারাবাহিক বৈঠক ও যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরির চেষ্টা জোরদার হয়েছে।
পাকিস্তানের এই উদ্যোগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টার একটি বৈঠক হয়েছে। তিনি বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ ও ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করে জানান, শিগগিরই আরেক দফা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে শাহবাজের প্রশংসা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফেরও বিশেষ উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তিনি শাহবাজকে ‘দারুণ মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে নিজের ভূমিকার প্রশংসা করতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন।
শাহবাজ শরিফ বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার তাঁর পাশাপাশি উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে আঞ্চলিক শান্তি ও সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরেন।
তেহরানেও সক্রিয় ইসলামাবাদ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ নেই। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি সোমবার তেহরান সফর করেন। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির সঙ্গে বৈঠক করেন।
ইরানি পক্ষ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বলে পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপে ফেরার বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি বা পরোক্ষ যোগাযোগ বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারা অন্যান্য বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা জাতিসংঘের
পাকিস্তানের উদ্যোগকে জাতিসংঘও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেছেন, পাকিস্তানের নেতৃত্বের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার জন্য মহাসচিব ‘অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ও প্রশংসাপ্রবণ’। ইসলামাবাদে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটিকে তিনি ‘একটি বড় অর্জন’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, সংঘাত বন্ধের অভিন্ন লক্ষ্যে পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এর ফলে জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে পাকিস্তান শুধু একটি অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমানোর চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দারের বৈঠক
এদিকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ‘রিজিওনাল-৪’ বা আর-৪ কাঠামোর বৈঠকে অংশ নেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে দার আর-৪ কাঠামোর প্রতি ইসলামাবাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য ধারাবাহিক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেন।
কূটনীতির নতুন জানালা
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। নিউইয়র্কে ইরানি প্রতিনিধিদলের কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ ও কর্তৃত্ব রয়েছে—এমন বার্তাও এসেছে তেহরানের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও বলছে, ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে—এমন আলোচনার জন্য তারা দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিউইয়র্কে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের তিন ঘণ্টার বৈঠক এবং পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তবে আলোচনার ফলাফল ও স্থায়ী সমঝোতার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।