
ঢাবি সংবাদদাতা: চাঁদাবাজি, লুটপাট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সরকারি চাকরিতে দলীয়করণের অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যঙ্গাত্মক ‘আনন্দ সভা’ করেছে বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গণে সংগঠনটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ব্যঙ্গাত্মক এ কর্মসূচিতে দেশের চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তুলে ধরেন ছাত্রনেতারা।
সভায় বক্তারা বলেন, বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সভায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন বক্তারা। একই সঙ্গে স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দুধসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির সম্পদে অনিয়মের অভিযোগেরও সমালোচনা করা হয়।
ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যে ছাত্রনেতারা বলেন, ‘সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মুরগির বিষ্ঠা চুরি এবং স্কুলশিক্ষার্থীদের দুধ চুরি বন্ধ করতে হবে।’ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
তবে এসব বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই তুলে ধরেন বক্তারা; এর সত্যতা যাচাই ও দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তারা।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে বক্তারা বলেন, এ ধরনের প্রবণতা থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তারা সরকারি নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তারা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি জোরদার এবং সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
তাদের ভাষ্য, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বাড়ছে, তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে জনভোগান্তি আরও বাড়বে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। তারা বলেন, নাগরিকের জানমাল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অপরাধীর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
সভায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জবাবদিহির বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, জনগণের কষ্ট, অনিয়ম ও দুর্ভোগকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। ব্যঙ্গাত্মক ‘আনন্দ সভা’র মাধ্যমে তারা বোঝাতে চেয়েছেন—যেসব বিষয় মানুষের উদ্বেগ ও দুর্ভোগের কারণ, সেগুলোকে যদি সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে প্রতিবাদও কখনো কখনো ব্যঙ্গের ভাষায় প্রকাশ করতে হয়।
বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের নেতারা বলেন, শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের দায়িত্ব শুধু ক্যাম্পাসের সমস্যা নিয়ে কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে।
সভা থেকে সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্সের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তাহ, জাতীয় ছাত্র শক্তির সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ আল মোদাচ্ছির, জুলাইভিত্তিক সংগঠন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী, ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, বৈষম্যবিরোধী কওমি ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব মাকসুদুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হাবিবুল্লাহ মেজবা, ছাত্রনেতা আবু দারদা এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান আসিফ।