
নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, মানবিকতা ও নাগরিকত্ববোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার। এ জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের অর্থ সঠিক ও কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (অর্থ ও পরিকল্পনা) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান অনুসন্ধান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের এবং দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ডিআরইউ সদস্যদের সন্তানদের মধ্যে ২০২৬ সালের এসএসসি এবং ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৩১ জন কৃতী শিক্ষার্থীর সংবর্ধনা ও বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।
কৃতী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সাফল্য মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। তবে সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের প্রতি, পরিবারের প্রতি, দেশের প্রতি এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা।
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজের রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও মানবিক দায়িত্বকে ধারণ করতে হবে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে অর্জিত জ্ঞান ও মেধাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
বর্তমানে বিজ্ঞান, গণিত, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, কৃতী শিক্ষার্থীরা সমাজে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। গণিত ছাড়া পদার্থবিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যা ছাড়া প্রকৌশল ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, একজন শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণি পাস করার পরও যদি তার জ্ঞানের মান সপ্তম শ্রেণির পর্যায়ে থাকে, তাহলে সেটি বড় ধরনের সমস্যা। দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানের মানও সেই পর্যায়ের হওয়া উচিত।
কৃতী শিক্ষার্থীরা নিজেদের অর্জন, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে রোল মডেল হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শিক্ষা খাতে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থ যথাযথভাবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো নাগরিকত্ববোধ তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি করা। শিক্ষাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী না হয়ে জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কৃতী শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হয়ে জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের মাধ্যমে দেশ ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে—এটাই প্রত্যাশা।
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, শিক্ষাজীবনে অর্জিত জ্ঞান, মেধা ও দক্ষতা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। ভবিষ্যতে দেশ গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান।
ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ‘তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ, জাতির উন্নয়নের চালিকাশক্তি।’ শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করলেই হবে না উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে নিজেদের সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কৃতী শিক্ষার্থীরা নিজেদের আলোকিত করার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশকে আলোকিত করবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্শিয়াল (এসবিএসি) ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, ক্যাপিটেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাসান রহমান এবং এসবিএসি ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং, কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের প্রধান মো. আসাদুল্লাহিল গালিব।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন ডিআরইউর সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম জসিম ও কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধা।
অনুষ্ঠানে ডিআরইউর অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা, নারী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. মনোয়ার হোসেন, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূইয়া এবং কার্যনির্বাহী সদস্য মাহফুজ সাদি ও আল আমিন আজাদসহ ডিআরইউ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে ২০২৬ সালের এসএসসি এবং ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ডিআরইউ সদস্যদের ৩১ সন্তানকে সংবর্ধনা স্মারক, বৃত্তি ও সনদ প্রদান করা হয়।
কৃতী শিক্ষার্থীদের এ সংবর্ধনা শুধু তাদের একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; একই সঙ্গে আগামী দিনে জ্ঞান, মেধা ও মানবিক মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে দেশ গঠনে তাদের আরও বড় ভূমিকা রাখার প্রত্যাশারও প্রতিফলন।