
সাব্বির হোসাইন: গাছের বিশালাকার কাণ্ডজুড়ে ঝুলছে শত শত গোলাকার বাদামি ফল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন গাছের গায়ে সারি বেঁধে লেগে আছে পাকা সফেদা। আবার সেই ফলের ফাঁক গলে ফুটে আছে চমৎকার রূপের কিছু ফুল। পুরু পাপড়ির সেই ফুলের কেন্দ্রস্থলে ফণা তুলে আছে যেন এক কালনাগ! বয়সের ভারে কিছুটা হেলে পড়লেও শতবর্ষী এই বৃক্ষটি আজও ফুল ও ফলে ভরা—যেন প্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক চিরযৌবনা রূপসী।
গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল রাজবাড়ি এলাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে এই বিরল বৃক্ষ—নাগলিঙ্গম। এটি কেবল একটি গাছ নয়; প্রকৃতির সৌন্দর্য, ইতিহাসের গৌরব এবং ভাওয়াল রাজাদের হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন।
প্রতিদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসা অসংখ্য মানুষ একবার হলেও থমকে দাঁড়ান এই গাছটির সামনে। কেউ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন, কেউবা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুঠোফোনে ছবি তুলতে।
বিশেষ করে মার্চ থেকে জুন মাসজুড়ে যখন গোলাপি, লাল ও হলুদের মিশেলে নাগলিঙ্গমের ফুল ফোটে, তখন পুরো রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে এক ব্যাকুল করা সুবাস। কাণ্ড ফুঁড়ে বের হওয়া ডালপালা জুড়ে ঝুলতে থাকে বড় বড় ফল, যা দেখতে অনেকটা বেলের মতো হওয়ায় অনেকে একে ‘ক্যানন বল’ নামেও ডেকে থাকেন।
ফুলের মধ্যবর্তী অংশে সাপের ফণার মতো একটি আকৃতি রয়েছে। নাগ বা সাপের এই অবয়ব এবং অনন্য রূপের কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে ‘নাগলিঙ্গম’।
নাগলিঙ্গম গাছের গুরুত্ব শুধুই সৌন্দর্যে আটকে নেই; এর শিকড় গেঁথে আছে ভাওয়াল রাজাদের ইতিহাসের গভীরে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ভাওয়াল রাজাদের আমলে রাজবাড়ির হাতিশালায় প্রায় ১৪-১৫টি হাতি ছিল। ‘গুন্ডা’, ‘ফুলমালা’, ‘রেবেকা’র মতো অদ্ভুত সব নামে ডাকা হতো সেগুলোকে। এর মধ্যে ভাওয়াল রাজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের সবচেয়ে প্রিয় হাতি ছিল ‘গুন্ডা’।
কথিত আছে, রাজবাড়ির পোষা হাতিগুলোর পেটে সমস্যা বা কোনো অসুখ হলে এই নাগলিঙ্গম গাছের ফল খাওয়ানো হতো, যা তাদের দ্রুত সুস্থ করে তুলত।
ভাওয়াল মির্জাপুর ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন জানান:
"ভাওয়াল রাজারা তাঁদের পালিত হাতির অসুস্থতা দূর করতে নাগলিঙ্গমের ফল ব্যবহার করতেন বলে প্রচলিত আছে। বর্তমানে গাছটি শুধু ইতিহাসের স্মারকই নয়, এটি মানুষকে দিচ্ছে মনোরম সুগন্ধ, শীতল ছায়া ও নির্মল সৌন্দর্য।"
কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেছে ভাওয়াল রাজাদের রাজকীয় ঐশ্বর্য। নেই সেই গমগমে হাতিশালা, নেই জমিদারি প্রথার জৌলুস। কিন্তু সব হারিয়েও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী এই নাগলিঙ্গম।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম গাছের সংখ্যা খুবই নগণ্য—ধারণা করা হয় সারা দেশে ৫০টিরও কম গাছ জীবিত রয়েছে। নির্দিষ্ট বয়স জানা না গেলেও বিশাল কাণ্ড ও বিস্তৃত ডালপালা দেখে প্রবীণদের বিশ্বাস, এটি শত বছরেরও বেশি সময় ধরে
রাজবাড়ির আঙিনা পাহারা দিচ্ছে।
প্রকৃতির অনন্য বৈচিত্র্য, রাজকীয় আবেগ আর ঐতিহ্যের বন্ধনে গাঁথা গাজীপুরের এই নাগলিঙ্গম বৃক্ষ। ফুল আর ফলের অবারিত সাজে এটি প্রতিদিন নতুন প্রজন্মকে শুনিয়ে যায় ভাওয়াল রাজবাড়ির হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনগুলোর গল্প।