
নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, যাঁরা পবিত্র কুরআন বুকে ধারণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তাঁদের কুরআনের শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে। তাঁদের মেহরাব থেকে নেতৃত্বের আসনে দেখতে চান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার রাজধানীর মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে পাঁচ মাসব্যাপী ‘হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
নগর উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে এবং সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এ প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাফেজ, আলেম-ওলামা, প্রতিযোগী ও তাঁদের অভিভাবকেরা অংশ নেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের আয়োজন বিরল। পাঁচ মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতা সফলভাবে সম্পন্ন করায় নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
সমাজ গঠনে ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ছোটখাটো মতপার্থক্য দূরে রেখে পবিত্র কুরআন ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
প্রতিযোগিতার ১০ পারা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জনকারী শিশু রিদওয়ান বিন আলীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, তাঁর বাবা-মা ও উস্তাদকে নিজের পক্ষ থেকে ওমরাহ পালনের ব্যবস্থা করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
এ সময় ঢাকা মহানগরী উত্তরের মানুষের কল্যাণে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে আল্লাহ যেন কবুল করেন এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় তাওফিক দান করেন, সে দোয়াও করেন তিনি।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুলাই শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় ঢাকার ৮০০টি মাদরাসার প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। পবিত্র কুরআনের ১০, ২০ ও ৩০ পারা—এই তিনটি পৃথক বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর ২৪৩ জনকে বিজয়ী নির্বাচন করে পুরস্কার দেওয়া হয়। ঘোষিত পুরস্কারের মধ্যে ছিল ওমরাহ পালনের সুযোগ, ল্যাপটপ, সাইকেল ও নগদ অর্থসহ বিভিন্ন উপহার। আয়োজকদের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, পুরস্কারের মোট নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল অর্ধকোটি টাকা।
আয়োজকদের ভাষ্য, হিফজুল কুরআনের চর্চায় উৎসাহ সৃষ্টি, হাফেজদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে কুরআন মুখস্থ করা ও শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতের আগ্রহ বাড়ানোই ছিল এ প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, তাঁরা শুধু পুরস্কার দেওয়া বা নেওয়ার জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেননি; বরং কুরআনের আলোয় সমাজকে আলোকিত করা এবং এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, হাফেজে কুরআনরা পবিত্র কুরআনকে নিজেদের জীবনে ধারণ করার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারে ভূমিকা রাখবেন—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।
মতপার্থক্য থাকলেও পবিত্র কুরআনের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ উল্লেখ করে সেলিম উদ্দিন বলেন, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে তিনি জানান, পাঁচ মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতা আয়োজনের পেছনে বহু মানুষ নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের প্রচেষ্টার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ আয়োজন কেবল পুরস্কার বিতরণী নয়; পবিত্র কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং এর শিক্ষা ও আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠার একটি সম্মিলিত প্রয়াস।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, পবিত্র আল-কুরআন সমগ্র মুসলিম জাতির জীবনবিধান। বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার হাফেজে কুরআন তৈরি হচ্ছেন, যা আনন্দের বিষয়।
নগর উন্নয়ন ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মূসা বলেন, এ সমাবেশ থেকে তাঁরা বাংলাদেশকে কুরআনের শিক্ষায় আলোকিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কুরআনের বিধান প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশিষ্ট আলেম মুফতি আলী হাসান উসামা এ আয়োজনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ উদ্যোগের প্রকৃত সার্থকতা আসবে তখনই, যখন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় মসজিদসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আলেম ও হাফেজরা দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন এবং দেশকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবেন।
প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক ও হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাফেজ আব্দুল হক এ ধরনের বৃহৎ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রশংসা করেন। তিনি এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা যায়নুল আবেদিন বলেন, যাঁরা কুরআন জানেন, মানেন এবং এর নির্দেশনা অনুসরণ করেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। সমাজকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, কুরআন সংরক্ষণে নিয়োজিত হাফেজদের নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাসের এ আয়োজন একটি স্মরণীয় উদ্যোগ। কিয়ামত পর্যন্ত কেউ আল-কুরআন মুছে ফেলতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ নিজেই তাঁর বাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।
কুরআনের শিক্ষার আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্বে আলেমদের ভূমিকা রাখার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে এবং এ আয়োজনের বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ, হাফেজদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন।
নগর উন্নয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম এবং হাফেজ খালিদ সাইফুল্লাহ বকশীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন এমপিসহ জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা, আলেম-ওলামা, প্রতিযোগী ও তাঁদের অভিভাবকেরা।
পাঁচ মাসের এ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আয়োজকেরা কুরআন শিক্ষার প্রসার, হিফজ চর্চায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করা এবং কুরআনের আদর্শকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।