
৮ নভেম্বর কালো ব্যাজ, ডিসেম্বরে মহাসমাবেশ; দাবি আদায় না হলে অবস্থান ও অনশনের হুঁশিয়ারি
সৈয়দ আখতার সিরাজী: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণ, চাকরির নির্ধারিত মেয়াদে উচ্চতর গ্রেড প্রদান এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শতভাগ পদোন্নতিসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে কর্মসূচি শুরু করেছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। ২০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দাবি আদায়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চেয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সুযোগও চেয়েছেন তাঁরা।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সমিতির নেতারা। সংবাদ সম্মেলন শেষে ডিআরইউ প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন শিক্ষকরা। সমিতির নীতি নির্ধারণী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি।
শিক্ষকদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীত করা, চাকরির আট ও ১৪ বছর পূর্তিতে প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি হয়রানিমূলক বদলির আদেশ বাতিল এবং ভিত্তিহীন বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতারা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার সহকারী শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বেতনগ্রেড, পেশাগত মর্যাদা ও পদোন্নতিসংক্রান্ত বৈষম্য নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্দোলনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
নেতারা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। এ স্তরে শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিনের বেতনবৈষম্য ও পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন না হলে শিক্ষকদের পেশাগত প্রত্যাশা পূরণ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
২০২৫ সালের আন্দোলনে পুলিশের পদক্ষেপের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন শিক্ষক নেতারা। তাঁদের দাবি, ওই বছরের ৮ নভেম্বর শাহবাগ এলাকায় আন্দোলন চলাকালে পুলিশের টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে বহু শিক্ষক আহত হন। আহত শিক্ষকদের মধ্যে ফাতেমা নামে এক শিক্ষকের পরবর্তী সময়ে মৃত্যু হয় বলে তাঁরা জানান। সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপিও ওই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষক নেতারা বলেন, তাঁরা সরকারের সঙ্গে সংঘাত চান না। বরং আলোচনা, পারস্পরিক আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান চান। তাঁদের মতে, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি দূর করার বিষয়েও সরকার ও শিক্ষকদের যৌথভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
দাবি আদায়ে ধারাবাহিক কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে সমিতির নেতারা জানান, আগামী ৮ নভেম্বর সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। একই দিনে নিহত শিক্ষক ফাতেমার রুহের মাগফিরাত কামনায় কেন্দ্রীয় দোয়া মাহফিল এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ১৭ ডিসেম্বর বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সংগঠনটির। ডিসেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অথবা শাহবাগে শিক্ষক মহাসমাবেশ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব কর্মসূচির পরও দাবির বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জাতীয় প্রেস ক্লাব অথবা শাহবাগে অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি পালনের কথাও জানিয়েছেন নেতারা।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে শিক্ষক নেতারা বলেন, তাঁরা শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বেতন ও পদোন্নতিসংক্রান্ত সমস্যা এবং প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়গুলো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরতে চান। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি দূর করা এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিজেদের প্রস্তাবও উপস্থাপন করতে আগ্রহী তাঁরা।
সমিতির নেতারা মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা শুধু একটি পেশাজীবী সংগঠনের দাবি নয়; এটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও মানসম্মত করে তোলার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দাবিগুলো পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, শিক্ষকদের তিন দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে এবং তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।