
এমএম রহমাতুল্লাহ: জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিতে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন না করে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী ৩১ অক্টোবরের লংমার্চ ঘিরে কোনো ষড়যন্ত্র বা বাধা সৃষ্টি করা হলে তা মোকাবিলা করে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, মুক্ত, বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক এবং তরুণদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাঁদের আন্দোলন কোনো দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পরিবারের স্বার্থে নয়।
জুলাই সনদের পটভূমি তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। সাত মাসের বেশি সময় আলোচনার পর বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সনদ তৈরি হয় এবং ২০২৫ সালে অংশীজনেরা তাতে স্বাক্ষর করেন।
ডা. শফিকুর রহমানের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজন করায় গণভোটের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তাঁর দাবি, জামায়াতসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান ছিল—আগে গণভোট, পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু বিএনপির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার একই দিনে দুটি ভোটের আয়োজন করে।
তিনি বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। জনগণের এই রায় উপেক্ষা করা যাবে না। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অতীতেও একাধিকবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, যার কিছু বিষয় আদালতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তাই পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে না গিয়ে প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তব্যে বিএনপি সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দ্রব্যমূল্য নিয়েও সমালোচনা করেন জামায়াত আমির।
তিনি অভিযোগ করেন, অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ ঠেকাতে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। চাঁদাবাজি ও দখলদারির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে করের বোঝা ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিদেশ থেকে প্রবাসীদের ফিরে আসার পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিতর্কে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে নিজের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সহযোগিতা নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সভায় বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আন্দোলন দমনে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করবেন না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবরের লংমার্চ ঘিরে কোনো ষড়যন্ত্র বা বাধা সৃষ্টি করা হলে তা মোকাবিলা করা হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ স্বস্তিতে বাঁচতে চায়। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আলোচনা সভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাতের পথ পরিহার করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হলে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কা শুরু থেকেই ছিল। তাঁর অভিযোগ, সনদে স্বাক্ষর ও গণভোট সম্পন্ন হওয়ার পরও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা দেখা যাচ্ছে।
তিনি একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান দাবি করেন।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টিকে শুধু সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ রেখে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে গণভোটের রায় কার্যকর করা জরুরি।
এ ছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলীও তাঁদের বক্তব্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং সরকারের সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা করেন।
সভায় জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তাদের বক্তব্যে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়ের সাংবিধানিক প্রতিফলন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।