
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্প, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাত ১২টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ত্যাগ করেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীরা। ফ্লাইটটির স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তারেক রহমানের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ ঘোষণা এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
বাংলাদেশের জন্য এই সফরের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা জোরদার করা।
গত ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সফর উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার পাশাপাশি বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
সফরে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। এ চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার অনুযায়ী এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচি রয়েছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব আলোচনায় উন্নয়ন অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
জ্বালানি ও শিল্প খাতে সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপানের চিবা অঞ্চলের ফুতসু শহরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের বিষয়টি রয়েছে। এ ছাড়া নাগোয়া শহরে ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা
কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্রসচিব জানান, এসব সমঝোতা স্মারকের মধ্যে তিন থেকে চারটি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে স্বাক্ষরিত হতে পারে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও পৃথক চুক্তির উদ্যোগ রয়েছে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষি ও মৎস্য খাতে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে চুক্তি বাস্তবায়ন, অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কত দ্রুত কার্যকর করা যায়, তার ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট
সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বাংলাদেশের জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়ে এশিয়ার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল বাংলাদেশ।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাঁচ দশকের অংশীদারত্ব
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশটির সহায়তায় ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও জনসম্পদ উন্নয়নের বিস্তৃত ক্ষেত্রে পৌঁছেছে। বর্তমান সফরের লক্ষ্য এ সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশটি সফর করেন ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে।
প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
সফরের সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা দ্রুত বাস্তব উদ্যোগে রূপ পায়, তার ওপর। বাংলাদেশ যদি প্রস্তাবিত বিনিয়োগ, সমঝোতা ও সহযোগিতা চুক্তিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।