
শুল্ক প্রক্রিয়া দ্রুত করা, ব্যবসা শুরুর অনলাইন সেবা ও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়িয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কার্যক্রম সহজ করতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংস্কার, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে আমদানিপণ্য দেশে পৌঁছানোর আগেই শুল্কায়ন ও ছাড়পত্রের হার ১০ গুণ বাড়ানো, অনলাইনে ব্যবসা শুরুর সমন্বিত সেবা চালু, চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির সপ্তম সভায় এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এ তথ্য জানিয়েছে।
সভায় কমিটির সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, সরকারি কার্যক্রমের প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, শুল্কহার ও বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বহিরাগত বিষয়গুলোর ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তবে নিজেদের নীতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উন্নত করার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো গেলে দ্রুত ও দৃশ্যমান সুফল পাওয়া সম্ভব।
সভায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহজীকরণে ইতোমধ্যে অর্জিত কয়েকটি সাফল্য তুলে ধরা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চালু করা ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) ব্যবস্থা কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারি দপ্তরে আনুমানিক ১২ লাখ মানুষের সশরীরে যাতায়াত কমিয়েছে।
এই অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা এক জায়গা থেকেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও নিয়ন্ত্রক সেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে কাগজপত্রের ব্যবহার, সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় ট্রাক প্রবেশব্যবস্থা চালুর ফলে বন্দরে ট্রাক প্রবেশের সময় অন্তত ৯০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থায় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বেড়েছে।
বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নে বিডা, বেজা, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিনিয়োগের সম্ভাব্য প্রকল্পগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জমি ইজারা চুক্তির ক্ষেত্রেও রেকর্ডসংখ্যক অগ্রগতি হয়েছে। চীন, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ায় সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে বেশ কিছু বিনিয়োগ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে।
তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পরও কিছু সরকারি দপ্তরে পাশাপাশি কাগজভিত্তিক কার্যক্রম চালু থাকায় সংস্কারের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অনলাইন সেবা চালুর পাশাপাশি এর ব্যবহার ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারির ঘাটতিকেও এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) ভালো উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন লুৎফে সিদ্দিকী। সংস্থাটির আবেদন ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজিটাল করা হয়েছে। পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের সহায়তায় বিভিন্ন স্থানে সহায়তা ডেস্ক রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও অনলাইন সেবায় অভ্যস্ত হতে ব্যবহারকারীদের সহায়তার জন্য একই ধরনের এজেন্ট ডেস্ক চালু করেছে বলে জানান বন্দর চেয়ারম্যান।
সভায় বিডার উদ্যোগে বাংলাদেশ বিজনেস পোর্টালের প্রথম সংস্করণ চালুর বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় তৈরি এ পোর্টালের মাধ্যমে ব্যবসা-সংক্রান্ত তথ্য ও সেবা সহজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এআরএমএস) পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পণ্য পরীক্ষা করার এ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় পণ্য খালাস ও শারীরিক পরিদর্শন কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমদানিপণ্যের আগাম শুল্কায়ন ও ছাড়পত্রের হার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান আগে থেকেই রয়েছে। এখন প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
তিনি বলেন, যেখানে আগাম ছাড়পত্রের হার ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত, সেখানে বর্তমানে তা ৫ শতাংশেরও কম। এ পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়।
আগাম শুল্কায়ন বাড়ানো গেলে বন্দরে পণ্য খালাসের সময় কমবে, আমদানি-রপ্তানির ব্যয় হ্রাস পাবে এবং ব্যবসায়ীদের সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির তথ্যনির্ভর ও বাস্তবায়নমুখী কার্যপদ্ধতির প্রশংসা করেন। তাঁরা এটিকে সরকারি কার্যক্রমে এক ধরনের ইতিবাচক কর্মপদ্ধতিগত সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফলাফল অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনুমোদনে বিলম্ব, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এসব সমস্যা দূর করতে শুধু প্রণোদনা বা নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়মনীতি, দ্রুত সরকারি সেবা এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি পুরোনো কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া বন্ধ করার ওপর।