
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন ন্যূনতম মজুরি কার্যকরের আহ্বান | ৩০৬ কারখানা বন্ধ, কাজে যোগ দিতে পারেননি প্রায় সাত লাখ শ্রমিক | ছয় মাসে ৯৫ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধের তথ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রম অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একদিকে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধির চাপে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনায় দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, শিল্পের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং চলমান সংকট নিরসনে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।
সংগঠনটি পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ ১৪ দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি বলেছে, শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের সুরক্ষা—দুটিকে সমান গুরুত্ব দিয়েই সংকটের সমাধান করতে হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে আতিকুর রহমান বলেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং শিক্ষাব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় অনেক শ্রমিক পরিবার নিয়ে মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি বলেন, এ অবস্থায় ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা না করে বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারের গঠিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১ নভেম্বর বোর্ড গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ডকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দিতে হবে। এতে শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত নতুন মজুরি ঘোষণা করা প্রয়োজন।
শিল্পের নিরাপত্তা ও শ্রমিকের অধিকার মুখোমুখি নয়
পোশাকশিল্পে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা এবং উৎপাদন ব্যাহত করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে কোনো কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে মালিক কিংবা শ্রমিক—কোনো পক্ষই লাভবান হবে না।
তাঁর মতে, কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারাবেন, মালিকেরা বিনিয়োগ হারাবেন এবং সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি। তাই শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানায় নাশকতা বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পেছনে কোনো নিষিদ্ধ স্বৈরাচারী সংগঠন কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে সহিংসতা ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩০৬ কারখানা বন্ধ, অনিশ্চয়তায় সাত লাখ শ্রমিক
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলমান শ্রম অসন্তোষে তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএর তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়, নভেম্বরের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে ৫০০ থেকে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বুধবার দুপুর ১টা পর্যন্ত ৩০৬টি কারখানা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে গাজীপুরে ১৬১টি, আশুলিয়ায় ৯৩টি এবং মিরপুরে ৫২টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫৭টি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়।
এই পরিসংখ্যান পোশাকশিল্পের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, এ শিল্পের সঙ্গে শুধু কারখানার শ্রমিকেরাই নন, পরিবহন, আবাসন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
আতিকুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল, নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানিতে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে মালিক ও শ্রমিককে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং আলোচনা, আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংকটের সমাধান করতে হবে।
শ্রমিকের মৃত্যুতে বিচার ও নির্যাতন বন্ধের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের সময় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। আতিকুর রহমান জানান, গত ৩ নভেম্বর মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চলাকালে তৌফিক শেখ (২১) নামে এক পোশাকশ্রমিক গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা, নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার-হয়রানি বন্ধ এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
১৪ দফা দাবিতে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১৪ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা।
২. শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৩. বিক্ষোভে আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
৪. ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা ও সহিংসতায় জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করা।
৬. গ্রেপ্তার হওয়া নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি দেওয়া।
৭. শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা।
৮. রাজনৈতিক পরিচয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধ করা।
৯. শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
১০. শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজন করা।
১১. শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন, স্বার্থান্বেষী মহল ও উসকানিদাতাদের ষড়যন্ত্র চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
১২. বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া, অন্যায় ও বেআইনি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের পুনরায় কাজে যোগদানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
১৩. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা।
১৪. শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা এবং পোশাকশিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা।
সংলাপ ও সমঝোতাই সংকট উত্তরণের পথ
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। আবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
তিনি সরকার, পোশাকশিল্পের মালিক, শ্রমিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা শুধু মালিক বা শ্রমিকের স্বার্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং লাখো পরিবারের জীবন-জীবিকা জড়িত। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখাও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু পোশাকশিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও পড়তে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ, গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো এবং শিল্পাঞ্চলে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে সংকট উত্তরণের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।