• ঢাকা |

শ্যামনগরে অবৈধ বালু উত্তোলনে ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধ, হস্তক্ষেপ চান উপকূলবাসী


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

হাইকোর্টের আদেশ অমান্যের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চান উপকূলবাসী

আশিকুর রহমান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা): সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খোলপেটুয়া নদীসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে বালু তুলে কার্গো ও বাল্কহেডে পরিবহন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোকালয়ে বোরিং করেও বালু তোলা হচ্ছে। এতে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ, নদীতীর ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব কার্যক্রম চললেও তা বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। তাঁরা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পাশাপাশি ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩৩–১৪৩৪ বঙ্গাব্দে সাতক্ষীরা জেলায় কোনো বালুমহাল ঘোষণা করা হয়নি। এরপরও শ্যামনগরের বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলার নওয়াবেকী বাজারের দক্ষিণ পাশে আরব আলী, জামান সাহেব ও সাবেক এক ইউপি সদস্যের বাড়ির কাছাকাছি নদীর চর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ভেতরে বালু মজুত করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মাসুদ মোড়, দাতিনাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোড় এবং মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পাশেও বালু মজুত ও বিক্রি করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পাশে ফেরদাউস নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বালু মজুত করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাতের আঁধারে বালু উত্তোলনের অভিযোগ

নওয়াবেকী এলাকার বড় কুপটের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে সারা রাত খোলপেটুয়া নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হয়। পরে বড় বড় কার্গোতে করে সেই বালু অন্যত্র পরিবহন করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চললেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীতীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ দুর্বল হয়ে লোকালয় ও কৃষিজমি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এ কার্যক্রম মহামান্য হাইকোর্টের ১৬৩৯২/২০১৭ নম্বর রিট পিটিশনের আদেশের পরিপন্থী। তবে সংশ্লিষ্ট আদেশের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও বর্তমান প্রযোজ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযানের পরও উত্তোলন বন্ধ হয়নি

স্থানীয় সূত্রের দাবি, সম্প্রতি গোলা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় এলাকাবাসী একটি কার্গোসহ দুজনকে আটক করে তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইনকে বিষয়টি জানান। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে জরিমানা না করে মুচলেকা নিয়ে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেন। তবে এ বিষয়ে তৎকালীন কর্মকর্তার বক্তব্য ও ঘটনার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে সাতক্ষীরা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রিপন বিশ্বাস বলেন, “সাতক্ষীরা জেলার মধ্যে বর্তমানে কোনো বালুমহালের দাগ নেই। আপনি তথ্য দেন, আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।”

প্রতিবেদকের দাবি, গত ১ অক্টোবর বালু মজুতের ১২টি ছবি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই তথ্যের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সম্প্রতি শ্যামনগরে যোগ দেওয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর শরীফকে বালু মজুতের ছবি ও অবস্থান পাঠানোর পর তিনি নওয়াবেকী এলাকায় গিয়ে বালুর স্তূপ ও উত্তোলন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বলে জানা গেছে। এ সময় একজনকে আটক করে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযানের দিন বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরদিন সন্ধ্যা থেকে আবারও একইভাবে উত্তোলন শুরু হয়।

সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের সুন্দরবনসংলগ্ন ৫২টি ইউনিয়নকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, মুন্সিগঞ্জ ও কৈখালী ইউনিয়নের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকায় বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টিও স্থানীয়দের আলোচনায় এসেছে। তবে এ-সংক্রান্ত ঘোষণার সুনির্দিষ্ট শর্ত ও প্রযোজ্য বিধান যাচাই করা প্রয়োজন।

উপকূলীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও তীরের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা, বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং সুন্দরবনসংলগ্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে।

দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি

শ্যামনগরের উপকূলীয় বাসিন্দারা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীতীর ও বেড়িবাঁধ সুরক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের মতে, শুধু সাময়িক অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত তদারকি, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।