নিজস্ব প্রতিবেদক: সমাজ পরিবর্তনে আলেমদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, উলামায়ে কেরামকে শুধু মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাতির ক্রান্তিলগ্নে সঠিক পথনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালনের মাধ্যমে তাদের সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হিসেবে দায়িত্ব নিতে হবে।
শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উলামায়ে কেরাম অংশ নেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উলামায়ে কেরামের ইলমচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে কোরআন ও সুন্নাহ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বিধান অনুসরণের পূর্ণাঙ্গ মডেল এবং সাহাবায়ে কেরাম তাঁর আনুগত্যের বাস্তব দৃষ্টান্ত। মুসলিম উম্মাহ এই আদর্শ অনুসরণ করলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি আলেমদের সত্য ও ন্যায়ের কথা বলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সত্য তুলে ধরতে গিয়ে কাউকে অপমান, হেয় বা কটূক্তি করা যাবে না। মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত এমনভাবে পৌঁছাতে হবে, যাতে তা তাদের হৃদয় স্পর্শ করে। প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর ভাষায় মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান জানানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
উলামায়ে কেরামের মধ্যে চিন্তা ও মতের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, অতীতেও মতপার্থক্য ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে অসম্মান করা উচিত নয়।
কেউ সমালোচনা বা কটূক্তি করলেও তার জবাবে পাল্টা কটূক্তি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের জন্য দোয়া করতে হবে। তার বক্তব্যে কোনো কল্যাণকর বিষয় থাকলে সেটিও গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনামূলক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে এমন মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। উসকানির জবাব উসকানি দিয়ে নয়, বরং ধৈর্য, সংযম ও বিচক্ষণতার সঙ্গে দিতে হবে।
দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে আলিয়া ও কওমি—দুই ধারার শিক্ষারই প্রয়োজন রয়েছে। আলিয়া শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজের প্রচলিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে কওমি শিক্ষায় শিক্ষিতরা দ্বীনের মৌলিকত্ব ধরে রেখে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তাই কোনো একটি ধারাকে বাদ না দিয়ে উভয় ধারার আলেম ও শিক্ষিত মানুষকে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় যত বেশি এগিয়ে যায়, বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও সেই জাতির তত বাড়ে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। উলামায়ে কেরামসহ সবাইকে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন ডা. শফিকুর রহমান।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও বিভিন্ন যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও যথাযথ প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান যুগেও যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য, গবেষণা, দক্ষতা ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।’ তবে কেউ আক্রমণ চাপিয়ে দিলে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। ইসলামের যুদ্ধনীতির বড় অংশই আত্মরক্ষামূলক ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর বিজয় নয়, মানবতার বিজয়ই প্রত্যাশিত—এমন মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তাই ন্যায়ভিত্তিক সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আল্লাহর বিধান ও ন্যায়নীতির আলোকে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। দেশের মানুষের মধ্যে সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আলেমদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে গেলে বাধা আসতে পারে। কিন্তু বাধার কারণে হকের কথা বলা থেকে বিরত থাকা যাবে না। একই সঙ্গে এমন কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া যাবে না, যা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে ধর্ম, বর্ণ ও ভাষা নির্বিশেষে সব মানুষকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মান, ঐক্য, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। মানুষ নিজের নফস বা প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত না হয়ে আত্মসংযম ও ন্যায়ের পথে চলতে পারলেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। প্রস্তাবনা উপস্থাপন ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি এবং তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি এবং ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।