• ঢাকা |

পাবনায় পৌরসভার প্ল্যান ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

পাশের ভবনে বড় বড় ফাটল, ১০ ভাড়াটিয়া পরিবারে আতঙ্ক; প্রাণহানীর আশঙ্কা

মনছুর আলম, পাবনা: পাবনা শহরের গোপালপুর ঝাউতলা রোডে পৌরসভার অনুমোদিত নকশা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণাধীন ভবনের জন্য গভীরভাবে মাটি খননের পর পাশের সাততলা ভবন ও অপর পাশের তিনতলা ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন ভবন দুটির বাসিন্দারা। যেকোনো সময় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাততলা ভবনের মালিক মো: জালাল উদ্দিন খান পাবনা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, নির্মাণাধীন ভবনের জন্য কোনো ধরনের সাইট প্রটেকশন বা নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়ে এক্সকাভেটর দিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত মাটি খনন করা হয়েছে। এতে তাঁর ভবনের পশ্চিম পাশের সীমানাপ্রাচীর, ভীত ও বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটলসহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে আনুমানিক ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ভুক্তভোগীর দাবি, তাঁর সাততলা ভবনটিতে বর্তমানে ১০টি ভাড়াটিয়া পরিবার বসবাস করছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেওয়ায় তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে ভবন হেলে পড়া বা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গোপালপুর ঝাউতলা রোডে জালাল উদ্দিন খানের সাততলা ভবনের পাশেই আবু জাহিদ মোহাম্মদ সেলিমের মালিকানাধীন ‘অরীন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার্স’-এর ‘আরএম প্যালেস’ নামে জি+৬ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। নির্মাণকাজ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে জালাল উদ্দিন পাবনা পৌরসভায় অভিযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ, পৌরসভা থেকে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়ার পরও নির্মাণসংশ্লিষ্টরা তা উপেক্ষা করে মাটি খনন অব্যাহত রাখেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ৪টা পর্যন্ত এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি খননের কাজ চলে। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টার দিকে জালাল উদ্দিন ও স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি দেখতে গিয়ে তাঁর ভবনের পশ্চিম পাশের সীমানাপ্রাচীর, ভিত ও বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল এবং ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পান। এরপর তিনি নির্মাণকাজ বন্ধ করা, সরকারি বিধিবিধান মেনে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁর ভবনের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করলে তাঁকে গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জালাল উদ্দিন খান বলেন, “আমার ভবনের একেবারে পাশ ঘেঁষে কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে গভীরভাবে মাটি খনন করা হয়েছে। এতে আমার ভবনের সীমানাপ্রাচীর ও বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি পৌরসভাকে জানানোর পরও নির্মাণকাজ চলতে থাকায় আমি এবং আমার ভবনের ভাড়াটিয়ারা আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমি চাই, ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজ বন্ধ করে প্রকৌশলগতভাবে ভবনের নিরাপত্তা যাচাই করা হোক এবং আমার ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।”

 

এ বিষয়ে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আব্দুল হামিদ খান বলেন, “পৌর এলাকায় পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যে খুব অল্প জায়গা থাকলে গভীরভাবে মাটি কাটার আগে পাশের ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের ভবন ঝুঁকিতে পড়ছে—এ বিষয়টি পৌরসভাকে জানানোর পর পৌর কর্তৃপক্ষ এসে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আবারও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

 

ঝাউতলা রোডের ফ্ল্যাট মালিক আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজে পৌরসভায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। সেখানে জানতে পেরেছি, নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাতের আঁধারে অনেক লোকজন দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে পাবনা পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো: খায়রুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্মাণস্থল পরিদর্শন করে অনুমোদিত নকশা, নির্মাণবিধি এবং পাশের ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করবেন। নিয়মবহির্ভূত নির্মাণকাজের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও পৌর বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে ‘অরীন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার্স’-এর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাশাপাশি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি ভবনের নির্মাণকাজ যেন অন্য ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে গভীর ভিত্তির জন্য মাটি খননের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, সাইট প্রটেকশন এবং পাশের স্থাপনার ঝুঁকি নিরূপণ না করে কাজ করা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ অবস্থায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে নির্মাণাধীন ভবনের অনুমোদন, নকশা, নির্মাণপদ্ধতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা এবং পাশের ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মালিক, বাসিন্দা ও স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।