বিরোধী দল সংসদে সমাধান চেয়েছিল, কিন্তু সরকার আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে: ডা. শফিকুর রহমান এমপি
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, গণভোটের গণরায় নিয়ে বিরোধী দল সংসদে সমাধান চেয়েছিল, কিন্তু সরকারই আমাদেরকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। যৌক্তিক ও জনগণের দাবিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিরোধী দলের সদস্যরা কোনো আপোষ করবেন না। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। মাত্র সাত মাসেই সরকার জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। গণভোটের রায় বাতিলের মাধ্যমে সরকার জাতির সঙ্গে তামাশা করেছে।
তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলেট সার্কিট হাউসে সিলেটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে উপরোক্ত কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় সিলেটে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময়কালে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার শুধু বিরোধী দলের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করবে, কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কি জাতি দায়িত্বশীল আচরণ আশা করতে পারে না? জাতীয় সংকট দীর্ঘায়িত করার দায় সরকার এড়াতে পারে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারের একেক মন্ত্রী একেক কথা বলছেন। জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ বলেন—সব বিষয়েই সরকারের মন্ত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। কোনো বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ একক সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না, কথাও বলতে পারছেন না। স্থানীয় নির্বাচন নিয়েও সরকার জাতিকে ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে বলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, অপরদিকে নির্বাচনের দিনক্ষণ তারাই ঠিক করে দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেটি স্পষ্টভাবে জাতিকে জানাতে হবে।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক নিয়েও সরকারের বক্তব্যের অসঙ্গতি তুলে ধরেন জামায়াত আমীর। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ মহাসড়ক নিয়ে সরকারের একেক মন্ত্রী একেক কথা বলছেন। কেউ বলছেন ২০২৮ সালে, আবার কেউ বলছেন ২০২৯ সালে কাজ শেষ হবে। ঠিক কোনটি হবে, সেটা সরকারই বলতে পারবে। আমরা শুধু চাপ সৃষ্টি কিংবা সুপারিশ করতে পারি।
একইভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব দ্রব্যমূল্যে পড়বে না—বাণিজ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রী ঠিক না বেঠিক বলেছেন, সেটা মানুষ নিজের চোখেই দেখতে পারছে। ইতোমধ্যে যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে, দ্রব্যমূল্যও বাড়তে শুরু করেছে। দিন দিন পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাবে না—এর নিশ্চয়তা কী? তাই মন্ত্রীদের দায়িত্বশীল কথা বলা উচিত।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জামায়াতের এক্সপার্ট টিম সরকারকে কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। আবার পরামর্শ চেয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের কতিপয় নেতার বক্তব্যে এমন মনে হচ্ছে, বিরোধী দল লংমার্চে যেসব গাড়ি নিয়েছে, সেগুলো সেদিন গ্যারেজে পড়ে থাকত। অথচ বিরোধী দল উপযুক্ত ভাড়া দিয়ে গাড়িগুলো নিয়েছে। এসব বিতর্ক তুলে সরকার বিরোধী দলের যৌক্তিক আন্দোলন নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শাহজালাল মাজারের দানের স্বচ্ছতা, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, হাম পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন জামায়াত আমীর। শাহজালাল মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বর্তমান কমিটির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের উদাহরণ দেন। মাজারের অর্থ সমাজসেবা ও দ্বীনের প্রচারে ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলে মানুষ উপকৃত হবে এবং দানে উৎসাহিত হবে বলে মন্তব্য করেন।
সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কেবল নামেই আছে উল্লেখ করে অবকাঠামোগত ও একাডেমিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
হাম আক্রান্ত ও মৃত্যু রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ভারত ও চীনের সহযোগিতা নেওয়ার কথাও বলেন।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন—জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা নাহাবিবুর রহমান, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-ঊন-নূর, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ও আসন্ন সিলেট সিটি নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, মহানগর সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহাজান আলী ও জেলা সেক্রেটারী জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।