• ঢাকা |

আইনশৃঙ্খলার সংকট থেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত এক সমাজ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং
ছবির ক্যাপশন:

সাবিনা ইয়াসমিন: দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন টালমাটাল, তখন তার প্রভাব শুধু রাস্তাঘাট বা সংবাদ শিরোনামেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি ধীরে ধীরে মানুষের মনের ভেতর ঢুকে পড়ে। প্রতিদিনের খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারহীনতার খবর মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী ভয়ের জন্ম দিচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার এই অনুভূতি মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন ও অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে।
একদিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অন্যদিকে অর্থনীতির চরম সংকট—এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষ যেন দিশেহারা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অভাব, আয় কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনকে প্রতিদিন নতুন করে কঠিন করে তুলছে। আগে যেখানে মানুষ কষ্টের মধ্যেও স্বপ্ন দেখত, এখন সেখানে স্বপ্ন দেখাটাই অনেকের কাছে বিলাসিতা হয়ে উঠছে। সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা, ঋণের চাপ, চাকরি হারানোর ভয়—সব মিলিয়ে মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলার দুরবস্থার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—ন্যায়বিচারের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়া। অপরাধ ঘটলেও বিচার হবে কি না, অপরাধী শাস্তি পাবে কি না—এই প্রশ্নগুলো মানুষকে ভেতরে ভেতরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে, যেখানে মানুষ মনে করে সে একা, রাষ্ট্র তার পাশে নেই। এই অনুভূতি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকলে তা মানসিক রোগে রূপ নিতে পারে—উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা, এমনকি আক্রমণাত্মক আচরণও দেখা দিতে পারে।
শহর থেকে গ্রাম—কোথাও মানুষ স্বস্তিতে নেই। রাতে নিরাপদে ঘুমানোর নিশ্চয়তা নেই, দিনে বাইরে বেরোলেই অজানা আতঙ্ক। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও অভিভাবকের বুক কাঁপে, পথে কিছু হয়ে যায় কি না। নারীরা তো প্রতিদিনই এক অতিরিক্ত ভয় নিয়ে বেঁচে থাকেন—রাস্তা, যানবাহন, কর্মক্ষেত্র সবখানেই নিরাপত্তার অভাব। এই দীর্ঘস্থায়ী ভয় নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পরিস্থিতিতে মানুষ ধীরে ধীরে সহনশীলতা হারাচ্ছে। সামান্য ঘটনায় রাগ, ক্ষোভ ও হিংস্রতা বেড়ে যাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সুযোগ বা সচেতনতা খুব কম, ফলে অনেকেই নিজের সমস্যাকে চেপে রাখছে। কিন্তু চেপে রাখা কষ্ট একসময় বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসে।
একটি দেশ শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সূচকে শক্তিশালী হলেই যথেষ্ট নয়; নাগরিকের মানসিক সুস্থতাও রাষ্ট্রের বড় সম্পদ। আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির এই দ্বৈত সংকট থেকে উত্তরণ না হলে, আমরা হয়তো এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি—যেখানে মানুষ বেঁচে থাকবে ঠিকই, কিন্তু শান্তি ও স্বস্তি ছাড়া। এখনই প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া। নইলে অদৃশ্য এই মানসিক বিপর্যয় একদিন দৃশ্যমান সামাজিক বিপর্যয়ে রূপ নেবে।