দিন-রাতে ভেকু দিয়ে পলিমাটি নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটায়
মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ গোমতী নদীর প্রায় ১০টি স্পটে পাড়ে অর্ধশত ভেকু লাগিয়ে দিনে-রাতে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করছে ডা. অলি ভূঁইয়াসহ প্রভাবশালীরা। এতে এককালের স্রোতস্বিনী গোমতী নদী একদিকে যেমন নাব্য হারিয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে মাটি বালুবাহী ট্টাক-ট্টাক্টরের বেপরোয়া চলাচলের কারণে নদীরক্ষা বাঁধ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। মাটি ও বালু দস্যুদের আগ্রাসনে পড়ে দিনে দিনে গোমতী নদী যৌবন হারালেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এ নদীকে পুঁজি করে রাতারাতি লাখ লাখ টাকার অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেকেই। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিদিন রাতে বেকুব দিয়ে গোমতী পাড়ের মাটি কেটে বোড়ার চর ইটভাটা ও অন্যান্য ইটভাটায় বিক্রি করে সরকারি সম্পদ নষ্ট করছে ভূঁইয়া বাহিনী।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুমিল্লা সূত্রে জানা গেছে, গোমতী নদীর পানি প্রবাহের উত্তপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অমরপুর, উদয়পুর সোনামুড়া নামক স্থানের পাহাড়ি বিভিন্ন এলাকা। এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার সীমান্ত দিয়ে বুড়িচং, দেবিদ্বার, মুরাদনগর হয়ে দাউদকান্দি উপজেলা দিয়ে আকাঁবাঁকা প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে।
বাংলাদেশ অংশে এ নদীর দৈর্ঘ্য ৮৩ কিলোমিটার এবং নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার ও বাম তীরে ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে। বাঁধের নদী অংশের ভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলন-বনজ গাছ-গাছালি রয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা নদী তীরে ধান, শাক-সবজি বিভিন্ন ফসলের আবাদ করে।
নদীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যখন যেই দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের স্থানীয় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় সিন্ডিকেট করে প্রভাবশালীরা গোমতী নদীর বালু ও মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করছে।
মুরাদনগর উপজেলার ছালিয়াকান্দি ইউনিয়ন ২ নং ওয়ার্ডের বালুচর, সুবিধার চর, জগতপুর ও উত্তরে বোড়ারচর মসজিদেথ পাশে গোমতী নদী তীরে ডা. অলি ভূঞা ১০ শতাংশ বিক্রি করে মুজিব ভূঁইয়ার ইটভাটায়। ডা. অলি ভূঞার ওই ১০ শতাংশ জমির পাশে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড গোমতী নদী ১শ'৫০ শতাংশ জমি। ওই ১শ' ৫০ শতাংশ জমি মাটি পাশের অবৈধ ইট ভাটা নিয়ে যাচ্ছে। জাহাপুর ইউনিয়ন হানিফার চর ও শুশুন্ডা চরসহ গোমতী নদীর ১০ টি স্পট দিয়ে। প্রায় শতাধিক মাটি বোঝাই ট্টাক ও ট্টাক্টরের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রতিরক্ষা বাঁধ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বেহালে পরিণত হয়েছে। এসব মাটি সাবেক ইউপির সদস্য মজিবুর রহমান ভূঁইয়ার অবৈধ ইটভাটায় বিক্রি করা হয়।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক বিভিন্ন পেশার অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ জানান, আপনাদের সাথে কথা বলে আমাদের পরিবার পরিজনকে বিপদে পরতে হবে, তবে পাউবোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র গোমতী নদীর বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন ও অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করছে। বিগত সময়ে সরকারের আমলে অবৈধভাবে গোমতী নদীর চর থেকে বালু ও মাটি বিক্রি করে শূন্য থেকে রাতারাতি লাখ কোটি টাকার অঢেল সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি গাড়ির মালিক হয়েছে অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবো কুমিল্লার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধ করে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষার জন্য পাউবোর পক্ষ থেকে নদী সংশ্লিষ্ট থানা উপজেলা নির্বাহী অফিসার একাধিক অভিযোগ করেও এসব কর্মকাণ্ড ঠেকানো যাচ্ছে না। উল্টো হুমকির শিকার হয়ে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থানায় জিডি করেছেন। একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাটি আনা-নেওয়ার কাজে নম্বরবিহীন ট্টাক্টর ব্যবহার করে থাকে, এ কারণে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) কুমিল্লা শাখা সভাপতি শাহ মোঃ আলমগীর খাঁন বলেন, গোমতী নদী বালু মাটি কাটার বিরুদ্ধে সুজন বহুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। কুমিল্লায় তিন মন্ত্রী মহোদয় রয়েছেন, তারা যেন এসব সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন, বালু মাটি উত্তোলনকারী যে দলেরই হউক, তার বিরুদ্ধে সরাসরি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হউক। যদি আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে এই গোমতী নদী বালু মাটি কাটার বন্ধ হবে না। মাননীয় সংসদ সদস্য ও ধর্মমন্ত্রীসহ মন্ত্রী মহোদয়গণ যেন সদয় দৃষ্টি দেন। এতে গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রাম ও ফসলাদী নস্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
মাটি ও বালুদস্যুদের আগ্রাসনে পড়ে গোমতী নদী দিনে দিনে নাব্য হারিয়ে পানিহীন ও সরু খালের মতো হয়ে পড়েছে। এতে ব্রাক্ষণপাড়া ও বুড়িচং উপজেলা বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে নদীর উত্তর পাশের লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, গোমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দন্ড প্রদান করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন বলেছেন, মাটি স্বাভাবিক উর্বরতা কমেছে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পরতে পারে। গোমতী নদী'র চর থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন --( শুক্রবার) থেকে গোমতীর এক ইঞ্চি মাটিও কাউকে কাটতে দেওয়া যাবে না।