• ঢাকা |

অবৈধ ইটভাটায় বিপর্যস্ত মাগুরার পরিবেশ: জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও চলছে ইটভাটা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২০ নভেম্বর, ২০২৫ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফারুক আহমেদ, মাগুরা: মাগুরা জেলা প্রশাসন থেকে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর জারি করা স্মারক নম্বর: ০৫.৪৪.৫৫০০.০০৯.০৯.০৪৭.২৫-৬৩৬–এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কোনো লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা আসন্ন মৌসুমে পরিচালনা করা যাবে না। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন,২০১৩ ও সংশোধিত আইন ২০১৯ অনুযায়ী-ইটভাটা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।মাগুরায় বৈধ ভাটা মাত্র ৩টি, অবৈধ ৯৯টি ভাটা, মাগুরা জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য মতে, মাগুরায় মোট ইটভাটা রয়েছে ১০২টি। এর মধ্যে আইন অনুযায়ী বৈধ ৩টি ইটভাটার মধ্যে শালিখা উপজেলায় শাহেদ ব্রিকস, দেয়াডাঙ্গা, মেসার্স পিয়ালস ব্রিক্স শতখালী ও অটো ব্রিক্স কৃষ্ণপুর/কছুন্দি, মাগুরা সদর। বাকি ৯৯টি ইটভাটা দীর্ঘদিন ধরে কোনো লাইসেন্স ছাড়াই চলছে, যার বেশিরভাগই স্থায়ী চিমনি বিচ্যুত, পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, ফিটনেস নেই, মাপ ১০/৫/৩–এর মানদণ্ড মানে না, এমনকি বেশ কিছু ভাটা কৃষিজমি দখল করে স্থাপন করা।এগুলোই এখন জেলার পরিবেশ-দূষণ, কৃষি উৎপাদন হ্রাস, নদী ভরাট, গ্রামীণ সড়ক ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ। অবৈধ ইটভাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মাগুরা: পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। বায়ুদূষণ ও জনগণের শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি, স্ট্যান্ডার্ড চিমনি না থাকায় ধোঁয়া নীচু স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রাম-গঞ্জের মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত।ক্ষুদ্রকণা (PM-2.5/PM-10) স্বাভাবিক সীমার বহু ওপর। মাগুরা জেলা জুড়ে রাস্তাঘাট ধ্বংস, ভাটায় অতিরিক্ত মাটি ও ইট বহনের ট্রাকে রাস্তা নষ্ট। মাগুরা সদর–মহম্মদপুর–শালিখা–শ্রীপুরের প্রতিটি উপজেলাতেই, ইউনিয়ন রাস্তা সংযোগ সড়ক গ্রামীণ ব্রিজ–কালভার্ট নিয়মিত ভেঙে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ইটভাটার ট্রাক ও ট্রলি ৩–৪ গুণ অতিরিক্ত ওজন বহন করে চলাচল করে। ফসলি জমি নষ্ট মাটি কাটার কারণে কৃষি উৎপাদনে ধস, অবৈধ ভাটার মালিকেরা
ফসলি জমির মাটি কেটে নেয়, পুকুরের পাড় ভেঙে নেয়, নদীর তীর কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করে, এতে তিন ফসলি জমি এক ফসলিতে পরিণত হচ্ছে। নদী–নালা ভরাট ও জলবায়ুগত ক্ষতির পাশাপাশি মাগরা, নবগঙ্গা, চিত্রা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাটা ছাই পড়ে নদী দখল হয়ে যাচ্ছে।
খোলা মাঠে কয়লা পোড়ানোয় জেলায় মাইক্রোক্লাইমেট পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে।স্মারকে জেলা প্রশাসক নির্দেশ দিয়েছেন“লাইসেন্সবিহীন কোনো ইটভাটা যেন চালু হতে না পারে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ”নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দেশ, অবৈধ বা চিমনি–বিহীন ইটভাটা স্থাপনের চেষ্টা দেখা মাত্রই ইউএনও ও জেলা প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে। এ থেকে স্পষ্ট—জেলা প্রশাসন অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে আর কোনো শিথিলতা দেখাবে না।মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের রায়নগর গ্রামে টপ টেন ইটভাটা ও গড়াই অবৈধ ইটভাটা মালিকদের বক্তব্য, অনেক বছর ধরে ভাটা চালাচ্ছি, এখন লাইসেন্স পাওয়াটা কঠিন। আমরা আবেদন করেছি কিন্তু অনুমোদন ধীরগতিতে আসে। বসুন্ধরা ব্রিকস সাচানী রাউতড়া, মালিক মাহবুব আলম বলেন, চিমনি নির্মাণে খরচ বেশি। আমরা ধীরে ধীরে বিধি মেনে চলার চেষ্টা করছি। সিন্ধাইন মহাম্মদপুর মীর ব্রিক্স এর মালিক শিবলু বলেন, ক্ষমতা থাকলে অনেককে ম্যানেজ করে অবৈধ ভাটাও চালানো যায়। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন-অর্থনৈতিক সুবিধার অজুহাত দিয়ে অবৈধ ভাটা পরিচালনা কোনোভাবেই বৈধ করা যায় না।

বৈধ ৩টি ভাটার মালিকরা জানিয়েছেন, আমরা লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, কর, সব নিয়ম মেনে ভাটা চালাই। কিন্তু ৯৯টি অবৈধ ভাটা কম দামে ইট বিক্রি করে বাজার ভেঙে দিচ্ছে। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। জেলা প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

মাগুরা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শোয়াইব মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, মাগুরায় অবৈধ ভাটার সংখ্যা অত্যন্ত বেশি।এগুলো বাতাস, মাটি, পানি, সব দিকেই বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। জেলা প্রশাসনকে আমরা সহযোগিতা করছি।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ হাসিবুল হাসান জানান লাইসেন্সবিহীন ভাটা বন্ধে অভিযান চলমান। কিন্তু অনেক মালিক রাত্রে ভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।

মোছা: আসমা আক্তার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাগুরা সদর জানান, অবৈধ ইটভাটা মালিকগণকে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসক মহোদয় কার্যালয় থেকে নোটিশ করে বন্ধের জন্য জানানো হয়েছে এরপরও যদি বন্ধ না করেন পরিবেশ অধিদপ্তর সহ সংশ্লিষ্টরা আইনের ব্যবস্থা নিবেন। ভাটা পরিচালনা করতে হলে অবশ্যই সরকারি ক্রাইটেরিয়া মেনে অনুমোদন পত্র সংগ্রহ করে ইটভাটা পরিচালনা করতে হবে এর বিকল্প নেই।

 কেন এত বিপর্যয় সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ভাটা? লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মালিকদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা। স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সীমিত জনবল। অবৈধ ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা হলেও অনেক সময় দ্রুত বিচার না হওয়া। প্রযুক্তি–মানদণ্ড (১০/৫/৩) না মানায় ইটের গুণগত মানও প্রশ্নবিদ্ধ।

জেলা প্রশাসনের প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাশা মাগুরাবাসীর দাবি-জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি ভাটার লাইসেন্স যাচাই, অবৈধ ৯৯টি ভাটা বন্ধ, অননুমোদিত মাটি কাটা ও পরিবহনে নজরদারি, গ্রামীণ সড়ক রক্ষায় মোবাইল কোর্ট জোরদার, পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ।

মাগুরার ১০২টির মধ্যে মাত্র ৩টি ভাটা বৈধ, এ বাস্তবতা জেলার পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও কৃষিকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করছে। জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক নির্দেশনা, অবৈধ ভাটা বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। অবৈধ ভাটা মালিকদের অনিয়ম, লাইসেন্সহীন কার্যক্রম ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘন আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করা উচিত নয়-মাগুরার ভবিষ্যৎ রক্ষায় দৃঢ় প্রশাসনিক পদক্ষেপই এখন একমাত্র পথ।

ইমতিয়াজ হোসেন উপপরিচালক (উপসচিব) স্থানীয় সরকার, জানান ইতিমধ্যেই অবৈধ ভাটা বন্ধ করে বৈধ ভাটা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে আশা করি তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।