ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন
ভূমিকা: ২০২৫ সালের বড়দিন বিশ্বে শান্তি, ভালোবাসা ও ঐক্যের বার্তা বহন করলেও ভারতীয় খ্রিস্টান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সেদিন ছিল ভয়, আতঙ্ক ও সহিংসতার একটি সময়। TRT World জানায় যে, ভারতে ওই দিন বড়দিন উদযাপন উৎসব “আতঙ্কের ছায়ায়” অনুষ্ঠিত হয় এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টানদের অনুষ্ঠানে হামলা ও বাধা সৃষ্টি করা হয় (TRT World, ২০২৫)। The Independent লিখেছে যে, খ্রিস্টানদের “হুমকি দেওয়া হয়েছে, অপমান করা হয়েছে এবং পাকিস্তানে চলে যেতে বলা হয়েছে” (The Independent, ২০২৫)। এসব ঘটনা ভারতে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সারা ভারতে সংঘটিত ঘটনা:-
বড়দিন উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সহিংসতা, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। EFE News রিপোর্ট করেছে যে, ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলগুলো বড়দিনের সাজসজ্জা পুড়িয়ে ফেলে এবং বহু এলাকায় খ্রিস্টানদের অনুষ্ঠানে হামলা করে—যা ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয় (EFE News, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫)।
ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়পুরে একটি শপিংমলের বড়দিনের সাজসজ্জায় হামলা চালানো হয় এবং তাতে শেষ পর্যন্ত পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়—Times of India এ তথ্য প্রকাশ করেছে (Times of India, ২০২৫)।
এছাড়া, আসামের নলবাড়িতে একটি স্কুলে বড়দিন উদযাপন নষ্ট করে দেওয়ার পর মৌলবাদী হিন্দুদের নগ্ন হস্তক্ষেপের বিচারের দাবিতে স্থানীয় খ্রিস্টান নেতারা মুখ খোলেন, যা প্রকাশ করেছে Economic Times (Economic Times, ২০২৫)।
বড়দিনের সময়ে গান, প্রার্থনা ও আয়োজন চলাকালীন খ্রিস্টানদের হেনস্তা করার ভিডিও যাচাই করে প্রকাশ করেছে The Independent (The Independent, ২০২৫)।
Countercurrents জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে এসব হামলার নিন্দা জানায় এবং এগুলোকে “পরিকল্পিত ও মতাদর্শ-প্রণোদিত” বলেছে (Countercurrents, ২০২৫)।
এসব তথ্য প্রমাণ করে বড়দিনে হওয়া ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসবকে পরিকল্পিতভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানোর ধারাবাহিকতার অংশ।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া:-
The Hans India জানায়, ম্যাঙ্গালোর ডায়োসিস এসব হামলাকে “সাংবিধানিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত” হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং ভারতের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সহনশীলতার সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছে (The Hans India, ২০২৫)।
এদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ANI-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে (India’s News / ANI, ২০২৫)।
The Week উল্লেখ করেছে যে, “সরকারের নীরবতা উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর মনোবল বাড়াচ্ছে” (The Week, ২০২৫)।
ভারতে খ্রিস্টানদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতা — নতুন নয়। Evangelical Fellowship of India তাদের রিপোর্টে দেখিয়েছে যে, সাম্প্রতিক বছরে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা “নিয়মিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুকরণ” (EFI Report, ২০২৫)।
Zenit প্রকাশ করেছে,
“ভারতে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা গত কয়েক বছরে ৫ গুণ বেড়েছে” (Zenit, ২০২৫)।
এটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সারা ভারতজুড়ে বড়দিনের সহিংসতা কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়—এটি একটি রাজনৈতিক-সামাজিক কাঠামোগত সমস্যা।
বৈশ্বিক বার্তা: নৈতিক দায়িত্ব ঘর থেকেই শুরু।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে, যা অঞ্চলের মানবাধিকার বাস্তবতা নির্দেশ করে:
“বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে সাম্প্রদায়িক বিষয়ে ভারতের নসিহত করার আগে, ভারতকে নিজ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে—এ আহ্বান এখন বিশ্বব্যাপী।”
বিশ্বমঞ্চে ক্রমবর্ধমানভাবে বলা হচ্ছে—
যে দেশ নিজ নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে ব্যর্থ,
সে দেশ অন্যদের কাছে নৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নিতে পারে না।
মানবাধিকার ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ
ভারতের সংবিধানের ১৪ ধারায় সমতার অধিকার এবং ২৫ ধারায় ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে।
কিন্তু বড়দিনের সময় খ্রিস্টানদের ওপর হওয়া হামলা ও আতঙ্কের পরিবেশ এই সাংবিধানিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে, মানবাধিকার সনদের ১৮ নং অনুচ্ছেদ —
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার ধর্ম বা বিশ্বাস স্বাধীনভাবে পালন ও প্রকাশ করার অধিকার রাখে।”
Countercurrents এবং Zenit-এর মতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন—
ভারতের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
উপসংহার:-
বড়দিন ২০২৫—ভারতে খ্রিস্টানদের জন্য ছিল উৎসবের দিন। কিন্তু
বহুস্থানে তা পরিণত হয়েছে হামলা, ভয়ভীতি ও অসম্মানের দিনে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা শুধু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়—
এটি মানব সভ্যতার নৈতিক দায়িত্ব। এটি
বিশ্ব আজ ভারতকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—
“অন্যকে সাম্প্রদায়িক সহনশীলতার উপদেশ দেওয়ার আগে, নিজেদের দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নৈতিকতার প্রথম ধাপ।”
একটি দেশের মানবিক মর্যাদা নির্ভর করে — সে কীভাবে দুর্বল সম্প্রদায়কে রক্ষা করে তার উপর।
সে অন্যকে কী উপদেশ দেয় সেটির উপর নয়।।
রেফারেন্স (মূল লেখায় উল্লেখিত)
TRT World. (2025). Christmas in India unfolds under shadow of fear and intimidation.
The Independent. (2025). Attacks and harassment during Christmas celebrations in India.
EFE News. (2025, Dec 26). Christmas in India marred by attacks, burning of decorations.
Times of India. (2025). Closed Raipur mall faces fringe fury on Christmas Day.
Economic Times. (2025). Assam Christian Forum seeks suo motu FIR over vandalism.
Countercurrents. (2025). International fraternity condemns attacks on Christmas.
The Hans India. (2025). Attacks on Christians during Christmas ‘assault on Constitution’.
India’s News / ANI. (2025). Opposition condemns vandalism, BJP responds.
The Week. (2025). Opposition criticizes government response to Christmas attacks.
Evangelical Fellowship of India. (2025). Systematic targeting of Christians — mid-year report.
Zenit. (2025). A 500% increase in attacks against Christians in India.
ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিশ্লেষক