শফিকুর রহমানের অভিযোগ, সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য নয়; এবি পার্টির দাবি, আশ্বাস শুনতে শুনতে জাতি বিরক্ত
এমএম রহমাতুল্লাহ: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে আসছে—এমন অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।
রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আয়োজিত ‘জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এবি পার্টির নেতারা অংশ নেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি মজলুম ছিল, কিন্তু এরপর তারা দ্রুত অতীতের কথা ভুলে গেছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি বদলে গেলেও বিরোধী দল বদলাবে না। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেই ছাড়বেন তাঁরা। তাঁর ভাষায়, “এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য নয়। আজ থেকে সরকারকে নয়, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে বিরোধী দল।”
তিনি আরও বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত করাও রাষ্ট্রের জন্য অপরাধ। তাঁর মতে, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আন্দোলন শুধু ১১-দলীয় জোটের নয়; ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন এটি।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকারের মুখে অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আশ্বাস শুনতে শুনতে জাতি বিরক্ত হয়ে গেছে। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, তা তাঁরা কল্পনাও করেননি।
তিনি বলেন, বিএনপি নিজেরাই দাবি করেছে, জুলাই আন্দোলনে তাদের ৮৪৮ জন কর্মী শহীদ হয়েছেন। শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।
শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, জাতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পরিণতি শেখ হাসিনাকে ভোগ করতে হয়েছে। বিএনপিরও একই ভুল করা উচিত হবে না।
মঞ্জু বলেন, জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ও সাত দফা অঙ্গীকার রয়েছে। এর অনেক কিছুই বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অথচ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এমন আচরণ করছে, যেন জুলাই সনদ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেন, সরকারকে বুঝতে হবে জনগণ কী চায়। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ধরনের কার্ড বিতরণের উদ্যোগ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন অলি আহমদ। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল এবং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি রূপরেখা। রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার কারণেই ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে এগিয়ে এসেছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের প্রশ্নে বিএনপি দ্বৈত অবস্থান নিয়েছে। সরকার গঠনের নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিলেও গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ কার্যকর করতেই হবে। অন্যথায় সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি অভিযোগ করেন, বিএনপি জুলাই সনদ নিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে।
তিনি বলেন, সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি তোলার উদ্দেশ্য ছিল সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা। জুলাই সনদ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার পরিস্থিতিকে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।
হাসনাত আব্দুল্লাহর অভিযোগ, সরকার রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাই সনদের মৌলিক চেতনা উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই সনদ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, সনদে স্বাক্ষর ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। বাস্তবায়নের প্রশ্ন উঠলেই সংবিধানের দোহাই দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে এবি পার্টি প্রস্তুত রয়েছে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
আলোচনায় বক্তাদের বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে আসে—জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য আলোচনায় পাওয়া যায়নি। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অগ্রগতি, গণভোটের রায় কার্যকরের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রশ্নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সভায় এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এবিএম খালিদ হাসান, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, বরিশাল সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর এবং ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্সসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।