ফিরোজ মাহবুব কামাল
প্রসঙ্গ ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড: পঁচিশে মার্চের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নিয়ে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। কারোই প্রকৃত সংখ্যাটি জানা নেই। মিথ্যা রটনায় বিস্ময়কর রেকর্ড গড়েছে কাদের সিদ্দিকী। সে তার বই "স্বাধীনতা ৭১"য়ে দাবী করেছে, পঁচিশে মার্চের এক রাতেই তিন লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কাদের সিদ্দিকী যে কতটা চিন্তাশূন্য আবাল সেটি বুঝা যায়, তার উর্বর মস্তিষ্কের এই বিস্ময়কর ভূয়া সংখ্যা থেকে। সামরিক এ্যাকশন সন্ধা রাতে হয়নি; শুরু হয়েছিল মধ্য রাতে এবং ভোর হওয়ার আগেই শেষ হয়। যেন আধা রাতের মধ্যে তিন লাখ মানুষ হত্যা করা এবং তাদের লাশ গায়েব করা অতি সহজ কাজ! এটি পর্বত প্রমাণ মিথ্যা। প্রশ্ন জাগে, মানুষ কতটা বিবেকশূন্য ও কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হলে এমন বিশাল মাপের মিথ্যা বিনা সংকোচে বলতে পারে? এমন বিবেকশূণ্যরাই নাকি বাংলার বীর! একাত্তরের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানে পাক সৈন্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার। পরবর্তীতে সে সংখ্যা ৪৫ হাজারে উন্নিত করা হয়। এ মিথ্যুক খুনি কাদের সিদ্দিকী নৃশংসতায় রেকর্ড গড়েছিল ৪ জন বিহারী বন্দীকে ঢাকা স্টেডিয়ামে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। নৃশংসতার সে চিত্র আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল।
পঁচিশে মার্চ রাতের ইতিহাস সংগ্রহ করেছেন গবেষক শর্মিলা বোস। সে কাজে তিনি পাকিস্তান গিয়েছিলেন। ২৫ মার্চের রাতে পাক সেনাবাহিনীর যে অফিসারের উপর অপারেশনের উপর দায়িত্ব ছিল তাঁর নাম হলো লে. কর্নেল (পরে ব্রিগেডয়ার) তাজ। অপারেশন চালিয়েছিল ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। তাঁর রিপোর্ট অনুযায়ী সে অপারেশনে ইকবাল হলে মারা যায় ১২ জন, জগন্নাথ হলে ৩২ জন এবং রোকেয়া হলে ৭ জন। রোকেয়া হলে মৃতদের সবাই ছিল সে হলের পুরুষ কর্মচারি। কোন ছাত্রী বা নারী সেখানে মারা যায়নি। সর্বমোট মারা যায় ৩০০ জন। সামরিক অফিসারদের ওয়ারলেস আলোচনার রেকর্ড থেকেও জানা যায় মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ জন। ২৫ মার্চের রাতে নিহত প্রফেসর জোতির্ময় গুহাথাকুরতার কন্যা প্রফেসর মেঘনা গুহাথাকুরতাও বলেন সে রাতে মারা গিয়েছিল ৩০০ জন। –( Bose, Sarmila.Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War. London: C. Hurst & Company, 2011.)।
২৫ মার্চ রাতে ট্যাংক বাহিনীর সাথে যিনি ছিলেন তার সাথে শর্মিলা বোস নিজে কথা বলেছেন। উক্ত অফিসারের নাম, লে. মুহাম্মদ আলী শাহ। তিনি ছিলেন ১৮ পাঞ্জাবের। তাঁর কথা, “ঐ রাতে সমগ্র ঢাকা শহরে নামানো হয় মাত্র তিনটি ট্যাংক। এ ট্যাংকগুলোর মূল কাজ ছিল শক্তির প্রদর্শনী”। তিনি আরো বলেন, “সে রাতে ঐ ট্যাংকগুলোর মুল কামানটি একটি বারের জন্যও ব্যবহৃত হয়নি। তবে আওয়াজ সৃষ্টির জন্য পাশের দুটো ছোট কামান থেকে মাঝে মাঝে গোলা ছোড়া হয়েছিল”। তিনি আরো বলেন, “তাঁর লোকেরা ট্যাংক তিনটি নিয়ে শুধু প্রধান প্রধান রাস্তা দিয়েই চলেছিল, কোন আবাসিক এলাকাতে ঢুকেনি। নিউ মার্কেট বা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও নয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রীদের উপর পাকিস্তানী সৈন্যদের বলাৎকার এবং বলৎকার শেষে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। সে অভিযোগ কতটুকু সত্য সেটি গুরুতর গবেষণা ও বিবেচনার বিষয়। সে সময় রোকেয়া হলের প্রোভোষ্ট ছিলেন বেগম আখতার ইমাম। তিনি বলেন, রোকেয়া হলে সর্বমোট ৮০০ জন ছাত্রীর জন্য স্থান ছিল। ২৫ মার্চের আগেই প্রায় সকল ছাত্রী হোস্টেল ত্যাগ করে। মাত্র ৭ জন ছাত্রী থেকে যায়। তাদেরকে সাহেরা খাতুন নামে একজন হাউস টিউটরের বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়। তাদের সবাই নিরাপদ ছিল এবং ২৭ মার্চ তারা তাদের অভিভাবকদের সাথে হোস্টেল থেকে চলে যায়। একই রূপ বিবরণ দিয়েছেন,তৎকালে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর জনাব ড. সাজ্জাদ হোসেন তাঁর “একাত্তরের স্মৃতি” বইতে। (ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন।একাত্তরের স্মৃতি, ঢাকা: নতুন সফর প্রকাশনী, ১৯৯৩)।
প্রসঙ্গ ৩০ লাখ বাঙালি হত্যা: বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচারিত মিথ্যাটি হলো, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ৩০ লাখ বাঙালির নিহত হওয়ার তথ্য। তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে, সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের বসবাস তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখ নিহতের সংখ্যা পূরণ হবে না।
তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে প্রতিদিন গড়ে ১১, ১১১ জনকে হত্যা করতে হয়। ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ ছিল একটি গ্রামীন জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ যার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ জনগণই গ্রামে বাস করতো। তখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ৬৮ হাজার গ্রাম ছিল। মোট ৬৮ হাজার গ্রামের মাঝে শতকরা ১০ ভাগ গ্রামে পৌঁছাতে হলে সেনাবাহিনীকে নদীনালা, দ্বীপ, বিল, হাওর ও চরে পরিপূর্ণ ৭ হাজার গ্রামে পৌঁছতে হয়। সেটি কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে ৯ মাসে পৌঁছা সম্ভব ছিল? তাছাড়া পুরা এপ্রিল মাস লেগে গেছে জেলা শহার গুলো কন্ট্রোলে নিতে। ফলে সহজেই ধারণা করা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৫ ভাগ গ্রাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধরা ছোয়ার বাইরে থাকে যায়। ফলে তিরিশ লাখের বিপুল হত্যাকান্ডটি ঘটাতে হতো জেলা, মহকুমা বা উপজেলা শহরে। তখন পাড়ায় পাড়ায় অসংখ্য নারীকে ধর্ষিতা হতে হতো। তখন ৩০ লাখ নিহতের সংখ্যা পূরণ করতে হলে শহর এলাকায় হত্যার হারটি প্রতি ১০ জনে একজনের বেশী হতো। এটি কি তাই বিশ্বাসযোগ্য? সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫ হাজার। এর মধ্য ৩৪ হাজার ছির নিয়মিত সৈনিক এবং ১১ হাজার ছিল Civil Armed Forces (CAF) য়ের। এ সংখ্যাটি দিয়েছেন তৎকালীন পাক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ. এ. কে নিয়াজী। -( Niazi, Lt Gen AA K. The Betrayal of East Pakistan, Karachi: Oxford University Press, 2002).
মাঠে গণনাকারি নামিয়ে কত জন মারা গেল সে হিসাব নিলে মুজিবের তথ্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হতো। খোদ মুজিব সেটি জানতো। তাই একাত্তরের নিহতদের সঠিক সংখ্যা সংগ্রহকে সে নিজের রাজনীতির জন্য অতিশয় ক্ষতিকর ভেবেছিল। বলা হয়ে থাকে, একাত্তরে প্রতি থানায় কতজন নিহত হয় তার একটি পরিসংখ্যান সংগ্রহের জন্য শেখ মুজিব থানার ওসি’দের নির্দেশ দেয়। সকল থানার ওসিগণ মৃতদের সংখ্যাটি স্বরাষ্ট্র দফতরে জমা দেয়। কিন্তু সংখ্যাটি এতোই কম ছিল যে, মুজিব সে পুরা পুলিশী রিপোর্টটিকে গায়েব করে দেয়। এর পর আর কখনোই আওয়ামী লীগ সরকার মাঠ পর্যায় থেকে নিহতদের পরিসংখ্যান সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়নি। এমন কি বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির সরকারও সে উদ্যোগ নেয়নি। কারণ এ দুটি সেক্যুলার দলও ৩০ লাখ নিহতের মিথ্যা নিয়ে রাজনীতি করেছে।
মিথ্যাকে যারা জন্ম দেয়, তারা সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয় সে মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখায়। নইলে তাদের মিথ্যা ভিত্তিক রাজনীতি বাঁচে না। মিথ্যাচারীরা প্রতি যুগে এভাবে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এভাবেই তো মূর্তি পূজা, সর্প পূজা, গরু পূজা এবং লিঙ্গপূজার ন্যায় সনাতন মিথ্যাচার শতকোটি অনুসারী নিয়ে বেঁচে আছে। এবং সে মিথ্যা বাঁচাতে হাজার হাজার পুরোহিত কাজ করে। এবং বাংলাদেশে একাত্তরে তিরিশ লাখ নিহতের মিথ্যা বাঁচাতে কাজ করছে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ফ্যাসিস্ট, বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ও বাঙালি বামপন্থী প্রচারক। নইলে আজও কি একাত্তরের নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান বের করা এতো কঠিন? নিহত আপনজনদের কথা কোন পরিবার কি শত বছরেও ভুলে? ফলে একাত্তরের নিহতদের স্মৃতি মাত্র ৪০ বা ৫০ বছরেই তারা ভুলে বসবে -সেটিও কি বিশ্বাস করা যায়? একাত্তরের নিহতদের সঠিক সংখ্যাটি জানায় রাজনৈতিক নেতাদের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে তারা এখনো সেটি করতে পারতো। কিন্তু সে আগ্রহ তাদের নাই।
অনেকেরই ধারণা, পাকিস্তান থেকে ফেরার পথে শেখ মুজিব যখন লন্ডন আসেন তখন ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি তাঁর কানে প্রথমে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ভারতই যে এ সংখ্যার জনক সে অভিমতটি প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক Professor Richard Sisson এবং Professor Leo Rose য়ের। ভারত-প্রদত্ত এ তথ্য নিয়ে সন্দেহ করার সাহস শেখ মুজিবের ছিল না। এবং ভারতকে মিথ্যুক প্রমানিত করায় মুজিবের সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। বরং মুজিব ও তার সহচরগণ তখন কৃতজ্ঞতায় ভারত বন্দনায় মগ্ন। কারণ, ভারতই যুদ্ধ করে তাকে ক্ষমতা বসিয়েছে। তাছাড়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃনাকে বাঁচিয়ে রাখায় মধ্যে ভারতের ন্যায় মুজিবও নিজের রাজনৈতিক মুনাফা দেখছিল। তাই মুজিব সরকারের পক্ষ থেকে নিহত তিরিশ লাখের সংখ্যাটি প্রচার করা হয় এবং কোনরূপ জরিপ না করেই ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে সে মিথ্যা সংখ্যাটি লিপিবদ্ধ করা হয়। এভাবেই বাঙালির ইতিহাসে এতো বড় ভিত্তিহীন মিথ্যাকে ইতিহাসের অংশে পরিণত করা হয়। এবং দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক ও মিডিয়া কর্মীদের মিথ্যুক ও মিথ্যার প্রচারকে পরণিত করা হয়। এভাবেই মিথ্যার প্রচারক হওয়াটি বাংলাদেশীদের সংস্কৃতির অংশ বানানো হয়।
আন্তর্জাতিক সমাজে বাংলাদেশের মান-সম্মানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গ্লানিকর কটাক্ষ শুরু হয় মূলত নিহতের সংখ্যা তিরিশ লাখ রটনা করার পর থেকে। তার কিছু উদাহরন দেয়া যাক। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। তাঁর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তিরিশ লক্ষটি মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে কতটা উদ্ভট ও অবিশ্বাস্য লেগেছিল সেটি ফুটে উঠেছে সে সময়ের মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট মন্ত্রী) মি. উইলিয়াম রজার্সের সাথে হেনরি কিসিঞ্জারের আলাপে। কিসিঞ্জার রজার্সকে বলেছিলেন: “Do you remember when they said there were 1000 bodies and they had the graves and they couldn’t find 20?”( Estimate of Richard Helms, CIA director, in a White House meeting on March 6 and 26, 1971 (FRUS, Vol XI, 11 and 2). অনুবাদ: “আপনার কি মনে আছে যখন তারা (বাংলাদেশীরা) বলেছিল যে এক হাজার মৃতদেহ আছে এবং তাদের কবরও আছে। অথচ তারা খুঁজে সেখানে বিশ জনও পায়নি।” হেনরি কিসিঞ্জারের এই একটি বাক্যের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠেছে নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি তাদের কাছে কতটা বড় রকমের অবিশ্বাস্য মিথ্যা মনে হয়েছে।
নিহতদের সংখ্যা ও গণকবর নিয়ে কঠাক্ষটি শুধু হেনরি কিসিঞ্জারের একার নয়। একই রূপ কঠাক্ষ করেছেন লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকার William Drummond। লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ানি পত্রিকার ১৯৭২ য়ের ৬ জুনে এক নিবন্ধে William Drummond লিখেছিলেন, “Of course, there are ‘mass graves’ all over Bangladesh. But nobody, not even the most rabid Pakistani-hater, has yet asserted that all these mass graves account for more than about 1,000 victims. Furthermore, because a body is found in a mass grave does not necessarily mean that the victim was killed by the Pakistani Army”.
অনুবাদ: “অবশ্যই বাংলাদেশ জুড়ে গণ-কবর রয়েছে। কিন্তু কেউই –এমনকি যারা চরম ভাবে পাকিস্তান বিদ্বেষী তারাও এতোটা প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারিনি যে, সে সব গণকবরে সব মিলিয়ে এক হাজারের বেশী লাশ আছে। উপরুন্ত, গণকবরে লাশ পাওয়া গেলেই সেটি প্রমাণিত হয় না যে, সে ব্যক্তি পাকিস্তানে আর্মির হাতে নিহত হয়েছিল।” একাত্তরে লক্ষাধিক বিহারীকে হত্যা করা হয়, William Drummond’য়ের দাবী গণকবরের লাশগুলি তো বিহারীদেরও হতে পারে। সরকারের হাতে তো এ নিয়ে কোন তথ্য নাই।
Mr. Drummond আরো লিখেন, “Killing fields and mass graves were claimed to be everywhere, but none was forensically exhumed and examined in a transparent manner, not even the one in Dhaka University. Moreover, the finding of someone’s remain cannot clarify, unless scientifically demonstrated, whether the person was Bengali and non-Bengali, combatant or non-combatant, whether death took palce in the 1971 war, or whether it was caused by the Pakistan Army”.
অনুবাদ: “বলা হয়, বধ্যভূমি ও গণকবর ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। কিন্তু কোথাও এ অবধি লাশকে কবর থেকে বের করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ময়না তদন্তের আয়োজন করা হয়নি। এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও নয়। তাছাড়া কারো মরদেহের পেলেই সে কি বাঙালী না অবাঙালী ছিল, যোদ্ধা না অযোদ্ধা ছিল বা ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিল -সেটি প্রমাণিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষার।”
অথচ বাংলাদেশে সেরূপ কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আয়োজন হয়নি। কারা মারা গেল, কতজন মারা গেল এবং কাদের হাতে মারা গেল, সেটি নির্ধারিত হয়েছে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং গুজবের ভিত্তিতে। সে গুজবের পিছনে কাজ করেছিল রাজনৈতিক মতলব। তাই ইতিহাস থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই বাদ দেয়া হয়েছে নিহত হাজার হাজার অবাঙালী ও পাকিস্তানপন্থীদের সংখ্যা।
গণহত্যা প্রসঙ্গে পাকিস্তান সরকারের রিপোর্ট: একাত্তরের নিহতদের নিয়ে বাংলাদেশে সরকার কোন হিসাব নিকাশের ব্যবস্থা না করলেও পাকিস্তান সরকার সেটির অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সে কমিশনের প্রধান ছিলেন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামদূর রহমান। ইনি নিজে একজন বাঙালী। উক্ত কমিশন একাত্তরে তিরিশ লাখের সংখ্যাটিকে “altogather fantastic and fanciful” বলেছেন। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় “সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং কল্পনাপ্রসূত”। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টারের হিসাব মতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যাটি পাওয়া যায় তৎকালীন আর্মির পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের পক্ষ থেকে হেড কোয়ার্টারকে দেয়া প্রতিদিনের সিচুয়েশন রিপোর্ট থেকে। তবে বিচারপতি হামদূর রহমান মনে করেন এ সংখ্যাটিও অতিরঞ্জিত। কারণ তখন আর্মির লোকেরা বিভিন্ন অপরাশেনে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের অপারেশনকে গুরুত্বপূর্ণ ও সফল দেখাতে গিয়ে নিহত শত্রুর সংখ্যা বেশী বেশী করে দেখাতে পারে। তবে এ ২৬ হাজারের মাঝে বাঙালীদের হাতে নিহত বিহারী বা অবাঙালীদের কোন পরিসংখ্যান নাই। নিহত অবাঙালীদের সংখ্যা অনিবার্য কারণেই এর চেয়ে অনেক বেশী হবে। কারণ, খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল, শান্তাহার, চট্টগ্রাম, যশোর, পাকশি, সৈয়দপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়ার ন্যায় প্রতিটি স্থানে অবাঙালীদের থেকে বেছে বেছে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা করা হয়নি, বরং গণহত্যার শিকার হয়েছিল অবাঙালী নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা। শর্মিলা বোস মনে করেন,একাত্তরে নিহতদের সর্বমোট সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ হতে পারে। এর মধ্যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরাও রয়েছে। জেনারেল নিয়াজীর হিসাব মতে তেসরা ডিসেম্বর অবধি প্রায় ৪ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের মৃত্যু ঘটে, আহত হয় আরো ৪ হাজার।-(Niazi, 1998)।