কল্লোল আহমেদ, লালমনিরহাট: লালমনিরহাট সদর উপজেলার শহীদ আবুল কাশেম মহাবিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও ৮ নম্বর গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী মো. আব্দুস সালামকে জড়িয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে একটি অভিযোগপত্র সম্প্রতি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে একাধিক পেশায় সম্পৃক্ততা, দায়িত্ব পালনে অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে অভিযোগপত্রটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে আবেদনকারীর নাম উল্লেখ থাকলেও তার পিতার নাম, পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বরসহ পরিচয় নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেই। অভিযোগপত্রটি আদৌ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দাখিল করা হয়েছে কি না, কে এটি তৈরি বা প্রচার করেছে এবং অভিযোগগুলোর ভিত্তি কী, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
এরই মধ্যে অভিযোগপত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়েছে। কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে ক্যাপশনসহ তা প্রচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা দাখিল এবং তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে ব্যঙ্গাত্মক বা অবমাননাকর ক্যাপশন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার চালানো হলে সেটি ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত সুনামের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও আইনগতভাবে বিবেচনার বিষয়।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় কোনো ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বা সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে জেনেও বক্তব্য, লিখিত বিষয়, চিহ্ন বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে কোনো অভিযোগ প্রকাশ বা প্রচারের বিষয়কে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম সাপেক্ষে মানহানির আওতায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আর ৫০০ ধারায় মানহানির শাস্তির বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ অভিযোগ করা এবং অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রচার করা এক বিষয় নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আর সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো অভিযোগ, বক্তব্য, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য আলাদাভাবে তুলে ধরা।
অভিযোগপত্রে কাজী মো. আব্দুস সালামের শিক্ষকতা এবং নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার একই সঙ্গে অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে ব্যক্তিভেদে প্রযোজ্য সরকারি বিধি, নিয়োগের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু অন্য ব্যক্তিরাও একই ধরনের পেশায় যুক্ত আছেন এমন দাবি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এ কারণে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি তথ্য, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ, উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে আবেদনকারীর নাম থাকলেও পূর্ণ পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃত অভিযোগকারী কে? তিনি নিজে অভিযোগটি করেছেন কি না? অভিযোগপত্রটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আদৌ জমা হয়েছে কি না? নাকি কারও নাম ব্যবহার করে অন্য কোনো পক্ষ এটি তৈরি ও প্রচার করেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, কোনো ব্যক্তির ক্ষতি বা সুনামহানির উদ্দেশ্যে জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি বা করানো হয়েছে, তাহলে বিষয়টি কেবল নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না, সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায়ও যেতে পারে। ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৮ ধারায় অন্য ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে আইনানুগ কারণ ছাড়া ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ আইনের অধীন মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা বা করানোর বিষয়ে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
অভিযোগপত্র ও পরবর্তী অনলাইন প্রচারের বিষয়ে কাজী মো. আব্দুস সালামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “কুচক্রী মহলকে শনাক্ত করার কাজ চলছে। যথাযথ সময়ে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি অভিযোগপত্রটির উদ্দেশ্য ও প্রচারের পেছনে কারা রয়েছে, তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণসহ অভিযোগ দাখিলের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা প্রয়োজন।